ইসরায়েলের ইতিহাসের অধিকাংশ সময়জুড়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও সেগুলো সাধারণত জনসমক্ষে আসত না। যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল, সময় নির্বাচন বা ঝুঁকি মূল্যায়ন নিয়ে তীব্র বিতর্ক হলেও তা অভ্যন্তরীণ পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকত। ফলে নাগরিকদের সামনে একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রের চিত্রই উপস্থাপিত হতো।
কিন্তু সেই দীর্ঘদিনের অলিখিত সমঝোতা এখন স্পষ্টভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর প্রায় তিন বছর পার হলেও মন্ত্রিসভার সদস্য ও সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক বিরোধের সূত্রপাত হয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে মোতায়েন ইসরায়েলি বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল আভি ব্লুথকে ঘিরে।
এক উগ্রপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীর আটকাদেশ বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় কাটজ প্রকাশ্যে ব্লুথের সমালোচনা করেন। পরে টেলিভিশনে সরাসরি ঘোষণা দেন যে ব্লুথকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু সেনাপ্রধান আইয়াল জামির প্রকাশ্যেই তার বিরোধিতা করে বলেন, ব্লুথ তার পদেই বহাল থাকবেন এবং এ ধরনের সিদ্ধান্ত নির্ধারিত সামরিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই নিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাই মূল বিষয় নয়; বরং এটি দেখিয়ে দিচ্ছে যে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে গভীর পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এখন বিরোধ কেবল সামরিক কৌশল নিয়ে নয়; বরং যুদ্ধের লক্ষ্য কে নির্ধারণ করবে, বিজয়ের অর্থ কী হবে এবং কী অর্জন করা সম্ভব- এই মৌলিক প্রশ্নগুলো নিয়ে।
ইসরায়েলে সেনাবাহিনী শুধু নির্বাহী বাহিনী ছিল না
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইসরায়েলের সেনাবাহিনী কেবল সরকারের নির্দেশ পালনকারী একটি প্রতিষ্ঠান ছিল না; বরং নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণের অন্যতম অংশীদার ছিল।
ডেভিড বেন-গুরিয়ন সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে ইৎজহাক রবিন, এহুদ বারাক, এরিয়েল শ্যারন, বেনি গান্টজ এবং ইয়োভ গ্যালান্টের মতো বহু রাজনৈতিক নেতা সেনাবাহিনী থেকেই উঠে আসেন। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক বিচার-বিশ্লেষণের মধ্যকার সীমারেখা সবসময়ই ছিল তুলনামূলকভাবে নমনীয়।
দীর্ঘদিন ধরে একটি অলিখিত নিয়ম কার্যকর ছিল: সেনাবাহিনী বাস্তবতার ভিত্তিতে রাজনীতির উচ্চাকাঙ্ক্ষার সীমা নির্ধারণ করত। জেনারেলরা নির্বাচিত নেতাদের বলতে পারতেন-কী সম্ভব, কী অসম্ভব এবং কোন সিদ্ধান্তের মানবিক ও সামরিক মূল্য কত হতে পারে। আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকলেও সেই ক্ষমতা পরিচালিত হতো সামরিক বাস্তবতার কাঠামোর মধ্যে।
দীর্ঘ যুদ্ধ বদলে দিয়েছে সম্পর্কের ভিত্তি
গাজা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে সেই সম্পর্ক এখন প্রায় উল্টে গেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি কারণকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রথমত, সময়ের প্রভাব। স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধে মতবিরোধ পেশাদার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু বছরের পর বছর চলা যুদ্ধে প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্তই রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। কতজন রিজার্ভ সেনা ডাকা হবে, কোথায় নতুন অভিযান চালানো হবে, জিম্মিদের জীবনের মূল্য বনাম সামরিক লক্ষ্য- এসব প্রশ্ন এখন সমাজের প্রতিটি স্তরকে স্পর্শ করছে।
দ্বিতীয়ত, বিজয়ের কোনও অভিন্ন সংজ্ঞা নেই। সরকারিভাবে হামাসের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস, জিম্মিদের ফিরিয়ে আনা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও বাস্তবে এই লক্ষ্যগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে যাচ্ছে। কারও কাছে হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল করাই মুখ্য, কারও কাছে জিম্মিদের মুক্তি অগ্রাধিকার, আবার কেউ দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্বের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছেন।
তৃতীয়ত, রাজনীতিবিদ ও সামরিক কর্মকর্তাদের প্রণোদনা ভিন্ন। সেনা কর্মকর্তারা বাহিনীর সক্ষমতা, হতাহত এবং যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতার মুখোমুখি হন। অন্যদিকে মন্ত্রীরা জোট সরকার, জনমত এবং পরবর্তী নির্বাচনের চাপের মধ্যে কাজ করেন। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, এই দুই ধরনের চাপের সংঘর্ষ ততই প্রকাশ্যে আসে।
চতুর্থত, সম্ভবের সীমা কে নির্ধারণ করবে?
আগে সেনাবাহিনী সরকারকে জানাত কোন লক্ষ্য বাস্তবসম্মত। এখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেনাবাহিনীকে বলে দিচ্ছে কী অর্জন করতেই হবে, আর তা সম্ভব না হলে সেনাবাহিনীকেই দায়ী করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল ভাষার পরিবর্তন নয়; বরং সরকার ও সেনাবাহিনীর সম্পর্কের কাঠামোগত রূপান্তর।
কর্তৃত্বের প্রশ্নে গভীর অনিশ্চয়তা
এর ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে- যুদ্ধের চূড়ান্ত দায়িত্ব কার?
প্রধানমন্ত্রী, নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা, প্রতিরক্ষামন্ত্রী নাকি সেনাপ্রধান-কে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ পরিচালনার দিকনির্দেশ নির্ধারণ করবেন? এই প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন উত্তর ভিন্ন কৌশল, ভিন্ন ঝুঁকি গ্রহণ এবং যুদ্ধ শেষ করার ভিন্ন সময়সীমা তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অনিশ্চয়তার বাস্তব প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে যৌথ লক্ষ্য নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ছে, উভয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য যুদ্ধসমাপ্তির পথ ক্রমেই অস্পষ্ট হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল কৌশল গড়ে তোলা আরও জটিল হয়ে উঠছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের সাম্প্রতিক প্রকাশ্য বিরোধকে তাই কেবল ব্যক্তিগত বা দলীয় দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে বদলে যাচ্ছে, তারই প্রতিফলন।
ইসরায়েলের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- যুদ্ধ যখন সপ্তাহ নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে চলে, তখন ‘কী সম্ভব’ তা নির্ধারণ করবেন কে? রাজনৈতিক নেতা, যার টিকে থাকা নিয়ন্ত্রণের চিত্র উপস্থাপনের ওপর নির্ভর করে, নাকি সেই জেনারেল, যিনি সামরিক শক্তির বাস্তব সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে ভালোভাবে জানেন?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে কেবল ইসরায়েলের সরকার ও সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নয়, বরং গাজা যুদ্ধ কীভাবে এবং কখন শেষ হবে, সেই সঙ্গে এর মানবিক মূল্য আর কত দূর পর্যন্ত গড়াবে।
সূত্র: আল-জাজিরা

