ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৪৫০ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। গত বুধবারের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখনও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে, দেশটির নাজুক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এই বিপর্যয় সামাল দিতে চরম সংকটে পড়েছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) বলছে, ভূমিকম্পের তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিবেচনায় প্রকৃত মৃতের সংখ্যা শেষ পর্যন্ত ১০ হাজার থেকে ১ লাখের মধ্যে হতে পারে। একই সময়ে একটি বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এখনও ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লা গুয়াইরা রাজ্য। সেখানে বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলো ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত উপকূলীয় এই রাজ্যের বহু বহুতল ভবন ধসে পড়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকা এখন ধ্বংসস্তূপ ও বালুর স্তূপে পরিণত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি দেলসি রদ্রিগেজ। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর নিরাপত্তা ও বাসযোগ্যতা মূল্যায়নে একটি রাষ্ট্রপতি কমিশন গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান এখনো চলছে। গতকাল রবিবারও আমরা কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করতে পেরেছি। তাই কোনো অবস্থাতেই এই অভিযান বন্ধ করা হবে না। আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশাবাদী।’
রদ্রিগেজ আরও জানান, জরুরি পরিস্থিতির কারণে স্কুল-কলেজের শ্রেণিকক্ষে পাঠদান আরও এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, লা গুয়াইরায় ইতোমধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
অব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য খাতে বিপর্যয়
উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ৭২ ঘণ্টা ইতোমধ্যে পার হয়ে যাওয়ায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা কমে আসছে। প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক মানুষকে খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের খুঁজতে দেখা গেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে এক মেক্সিকান দুর্যোগ মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ বলেন, ভেনেজুয়েলার উদ্ধার সরঞ্জাম আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কয়েক দশক পিছিয়ে রয়েছে। এ কারণে উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
ভূমিকম্পের পর দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও কার্যত ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় এক চিকিৎসক জানান, সাধারণ সময়েই রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হতো। সেখানে এত বড় দুর্যোগ পরিস্থিতি সংকটকে আরও গভীর করেছে।
অন্যদিকে বিরোধী দলের নেতাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং জনসেবা খাতের অবনতির কারণে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা অনেকটাই হারিয়েছে রাষ্ট্র।
ক্ষুব্ধ ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা
উদ্ধার অভিযানে সরকারের ভূমিকা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দুর্গত এলাকার বাসিন্দা উইলবার জানান, ভূমিকম্পে তিনি আটজন স্বজনকে হারিয়েছেন। তার অভিযোগ, রাষ্ট্র কার্যকর সহায়তা দেওয়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে উদ্ধারকাজেও বাধা সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, প্রধান সড়কগুলো বন্ধ থাকায় দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে চরম সমস্যা হচ্ছে। এমনকি বিশেষ অনুমতি সংগ্রহ করতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
তবে সরকারের দাবি, ইতোমধ্যে পর্যাপ্ত উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের সমন্বয় করা হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি, ফ্রান্স টোয়েন্টিফোর

