আলামিন আসিফ :নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি
যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডাকযোগে বা মেইলে ভোট দেওয়ার পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনা আটকে দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।
সোমবার দেওয়া এক আদেশে আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতি প্রশাসনের প্রস্তাবিত নতুন নিয়ম কার্যকর করার পথ বন্ধ করে দেন।
নির্বাচন কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছিলেন, নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এই ধরনের পরিবর্তন কার্যকর করা হলে দেশজুড়ে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে এবং লাখ লাখ ভোটার ভোট দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এমনকি রিপাবলিকান দলের কয়েকজন নির্বাচন কর্মকর্তাও প্রস্তাবটির সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
সুপ্রিম কোর্টের তিন বাক্যের স্বাক্ষরবিহীন আদেশে বলা হয়েছে, প্রশাসন তাদের আইনি চ্যালেঞ্জের মূল বিষয়ে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে আদালত বিস্তারিত কোনও ব্যাখ্যা দেয়নি। রক্ষণশীল বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো ও ক্ল্যারেন্স থমাস এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হননি।
এই রায় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের আইনি পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্প ডাকযোগে ভোটের বিরোধিতা করে আসছেন এবং এ পদ্ধতিতে ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ করে আসলেও তার এসব দাবির পক্ষে বড় পরিসরের ভোট জালিয়াতির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই সময়ে ট্রাম্প নিজেও বিভিন্ন নির্বাচনে ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন।
ডাক বিভাগের ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা
ট্রাম্প প্রশাসন প্রস্তাবিত পরিবর্তনকে ‘সীমিত’ ধরনের ডাক-সংক্রান্ত বিধিমালা পরিবর্তন হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। প্রশাসনের দাবি ছিল, ডাকযোগে পাঠানো ব্যালটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কেবল যোগ্য ভোটারদের কাছেই ব্যালট পৌঁছানো নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য।
তবে সমালোচকেরা এটিকে প্রেসিডেন্টের অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগের চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেন। তাদের মতে, সংবিধান অনুযায়ী ভোট গ্রহণের পদ্ধতি নির্ধারণের মূল ক্ষমতা অঙ্গরাজ্য ও কংগ্রেসের হাতে; হোয়াইট হাউস কিংবা ইউএস পোস্টাল সার্ভিসের হাতে নয়।
প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, অঙ্গরাজ্যগুলোকে যোগ্য ভোটারদের তালিকা ইউএস পোস্টাল সার্ভিসের কাছে জমা দিতে হতো। ওই তালিকায় নাম না থাকা ব্যক্তিদের কাছে পাঠানো ব্যালট ডাক বিভাগ আটকে দিতে পারত।
এছাড়া ব্যালটের খামে বিশেষ ট্র্যাকিং বারকোড ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আরোপের কথা ছিল। অযোগ্য ভোটার বা অ-মার্কিন নাগরিকদের কাছে ব্যালট পাঠানো বা তাদের কাছ থেকে ব্যালট গ্রহণের ঘটনায় অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফেডারেল মামলা করার বিষয়টিকেও অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছিল।
নির্বাচন কর্মকর্তাদের বড় উদ্বেগ
মামলার শুনানিতে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তারা সুপ্রিম কোর্টকে সতর্ক করে বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের এত কাছাকাছি সময়ে ডাকযোগে ভোটের নিয়ম পরিবর্তন করা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন।
তাদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ ছিল, প্রস্তাবিত ব্যবস্থার জন্য ভোটারদের বিপুল পরিমাণ তথ্য একটি অনলাইন পোর্টালে জমা দিতে হতো। কিন্তু সংশ্লিষ্ট অনলাইন ব্যবস্থা তখনও পুরোপুরি চালু হয়নি।
এছাড়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী ব্যালটের খামের নকশায়ও পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হতো। অথচ অনেক অঙ্গরাজ্য ইতোমধ্যে নতুন নির্বাচনের জন্য ব্যালটের খাম ছাপিয়ে কিনে ফেলেছে এবং কিছু জায়গায় সেগুলো ভোটারদের কাছে ডাকযোগে পাঠানোও শুরু হয়ে গিয়েছে।
ফলে শেষ মুহূর্তে নিয়ম পরিবর্তন করলে পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়।
পুরো চালান আটকে যাওয়ার আশঙ্কা
মামলাটিকে আরও জটিল করে তোলে ইউএস পোস্টাল সার্ভিসের এক হুইসেলব্লোয়ারের সতর্কবার্তা।
সুপ্রিম কোর্ট যখন বিষয়টি বিবেচনা করছিল, তখন ওই হুইসেলব্লোয়ার অভিযোগ করেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কোনও একটি ব্যালটের খামে বারকোডে সমস্যা দেখা দিলে শুধু সেই ব্যালটটি আটকে রাখা হতো না। বরং সেটির সঙ্গে একই ব্যাচে পাঠানো পুরো ব্যালটের চালান আটকে যেতে পারত।
এতে অল্পসংখ্যক কারিগরি ত্রুটির কারণে বিপুলসংখ্যক বৈধ ভোটার তাদের ব্যালট সময়মতো না পাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তেন।
হুইসেলব্লোয়ার আরও জানান, নির্বাচন ঘনিয়ে আসার মধ্যে একটি জটিল অনলাইন তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা দ্রুত চালু করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। তার আশঙ্কা ছিল, তাড়াহুড়ো করে ব্যবস্থা চালু করলে ভোটারদের ব্যাপকভাবে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
বিচারপতি কাভানাফের আলাদা মত
সুপ্রিম কোর্টের রক্ষণশীল বিচারপতি ব্রেট কাভানাফ সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হলেও আলাদা একটি মতামত লিখেছেন।
তিনি মনে করেন, প্রস্তাবিত নিয়ম তৈরির ক্ষেত্রে ইউএস পোস্টাল সার্ভিসের কিছুটা এখতিয়ার থাকতে পারে। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এত অল্প সময়ে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের পক্ষে নতুন নিয়ম বাস্তবায়ন করা যুক্তিসংগতভাবে সম্ভব নয়।
কাভানাফের এই অবস্থান থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ভবিষ্যতের কোনও নির্বাচনে একই ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি সেটি বিবেচনা করতে পারেন।
আলিটোর ভিন্নমত
রক্ষণশীল বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন।
তার মতে, নির্বাচন কর্মকর্তাদের উত্থাপিত বাস্তবায়নগত সমস্যাগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলো অঙ্গরাজ্য ও ভোটাধিকার সংগঠনগুলোর চ্যালেঞ্জকে সফল করার মতো যথেষ্ট কারণ নয়।
আলিটো বলেন, ডাকযোগে ব্যালট ব্যবস্থার ওপর ফেডারেল সরকারের বিধি প্রয়োগে শক্তিশালী স্বার্থ রয়েছে। তার মতে, নতুন ব্যবস্থা ফেডারেল ব্যালট ডাকের ওপর নজরদারি বাড়িয়ে সম্ভাব্য নির্বাচনী জালিয়াতি শনাক্ত করতেও সহায়তা করতে পারত।
তবে তিনি স্বীকার করেন, নির্বাচনের খুব কাছাকাছি সময়ে নিয়ম পরিবর্তনের বাস্তব সমস্যা গুরুতর। তারপরও সেটিকে নিয়মটি আটকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট কারণ হিসেবে তিনি দেখেননি।
‘হেইল মেরি পাস’ মন্তব্য
আলিটো তার ভিন্নমতামতে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগকে রূপক অর্থে ‘হেইল মেরি পাস’-এর সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, ডাক ব্যবস্থাপনা ও ডাক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ইউএস পোস্টাল সার্ভিসের বিস্তৃত ক্ষমতা রয়েছে।
তবে শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির সিদ্ধান্তে প্রশাসনের উদ্যোগটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য কার্যত অকার্যকর হয়ে গেল।
‘গণতন্ত্রের বিজয়’ বলছে বিরোধীরা
সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের পর মামলাটি করা অঙ্গরাজ্য ও ভোটাধিকার সংগঠনগুলো সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
কলোরাডোর ডেমোক্র্যাট সেক্রেটারি অব স্টেট জেনা গ্রিসওল্ড বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ২০২৬ সালের নির্বাচনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বন্টা এই সিদ্ধান্তকে গণতন্ত্রের বিজয় এবং আইনের শাসনের শক্তিশালী স্বীকৃতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছিল দুই ডজনের বেশি ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত অঙ্গরাজ্য এবং বিভিন্ন ভোটাধিকার সংগঠনের জোট। তাদের অভিযোগ ছিল, ডাকযোগে ভোটে ব্যাপক জালিয়াতির প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে এ পদ্ধতি নিয়ে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আসছেন।
এর আগেও সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল প্রশাসন
ডাকযোগে ভোটের নিয়ম পরিবর্তনের এই উদ্যোগ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এর আগেও সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল।
আগস্টের শেষ দিকে আদালত প্রশাসনকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিল। তবে সেটি ছিল মূলত মামলাটি চ্যালেঞ্জ করার সময় ও আইনি প্রক্রিয়ার কারিগরি বিষয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। এর কয়েক দিন পরই নিম্ন আদালত প্রস্তাবিত পরিবর্তন কার্যকর করার ওপর স্থগিতাদেশ দেয়।
এরপর নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় বিষয়টি আবার জরুরি ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টে আসে।
সাম্প্রতিক সময়ে জরুরি আবেদনের বিভিন্ন মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বেশ কয়েকবার ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। নিম্ন আদালত কোনও নীতি আটকে দিলে প্রশাসনের সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি আদালত গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু এবার বিচারপতিরা মনে করেছেন, ভোটারদের সম্ভাব্য ক্ষতি ও অন্যান্য ‘ন্যায্যতার বিষয়’ প্রশাসনের দাবির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সংবিধান নিয়ে বিতর্ক
এই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট কতটা হস্তক্ষেপ করতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন পরিচালনার নিয়ম নির্ধারণের ক্ষমতা মূলত অঙ্গরাজ্য ও কংগ্রেসের হাতে। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ডাক বিভাগকে ব্যবহার করে অঙ্গরাজ্যগুলোর ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা যায় কি না, সেটিই মামলার কেন্দ্রীয় আইনি প্রশ্নগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
প্রস্তাবিত নিয়ম কার্যকর হলে অঙ্গরাজ্যগুলোকে নতুন করে ভোটারদের তথ্য সরবরাহ, ব্যালটের খামে পরিবর্তন এবং ডাক বিভাগের সঙ্গে নতুন ধরনের সমন্বয় করতে হতো।
নির্বাচনের ঠিক আগে এসব পরিবর্তন কার্যকর হলে বৈধ ভোটারদের ব্যালট আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এই আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সূত্র: সিএনএন

