যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পরও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে প্রকাশ্যে দেখা বা তার কণ্ঠ শোনা যায়নি। এ নিয়ে দেশটিতে তার প্রকৃত ভূমিকা ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই বাড়ছে। তবে ইরানি কর্মকর্তা ও দেশটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সূত্রের দাবি, তিনি এখনও ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করছেন।
যুদ্ধের শুরুতে গুরুতর আহত হওয়ার পর মোজতবা সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন। এরপর থেকে তার কোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও বার্তা প্রকাশিত হয়নি। নিরাপত্তার কারণে তিনি আড়ালে থেকে দেশ পরিচালনা করছেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, মোজতবা নিয়মিত শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, গুরুত্বপূর্ণ সব প্রতিবেদন পাচ্ছেন এবং বড় সব সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত অনুমোদন দিচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও ১০ আগস্ট জানান, তিনি মোজতবার সঙ্গে সাত ঘণ্টার বৈঠক করেছেন।
তবে তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, প্রশ্নটি এখন আর মোজতবা বেঁচে আছেন কি না, তা নয়; প্রশ্ন হলো ইরানে এখনও কার্যকর কোনো সর্বোচ্চ নেতা আছেন কি না।
ইরানের কট্টরপন্থী সমর্থকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কোমের এক বাসিজ সদস্য বলেন, নেতার কণ্ঠ শোনা বা তার নেতৃত্বের কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া গেলে জনগণের আত্মবিশ্বাস বাড়ত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, মোজতবা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তবে তার একটি ছবিও প্রকাশ না হওয়ায় মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সংস্কারপন্থী এক ব্যবসায়ী আরও সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, মোজতবা নিহত হননি—আমরা তা কীভাবে জানব? তার মতে, তিনি বেঁচে আছেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত—এর পক্ষে কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ না থাকা যৌক্তিক নয়।
ক্ষমতার কেন্দ্রে বিপ্লবী গার্ড
ছয় মাসের যুদ্ধে ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা টিকে আছে। দেশটির সামরিক বাহিনী এখনও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বাধা সৃষ্টি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
তবে যুদ্ধের ব্যয় ও কয়েক মাসের তেল রপ্তানি অবরোধে দেশটির অর্থনীতি চাপে পড়েছে। মুদ্রা রিয়ালের বড় পতন হয়েছে। এতে জানুয়ারিতে কঠোরভাবে দমন করা ব্যাপক বিক্ষোভ আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিপ্লবী গার্ডের প্রভাব আরও বেড়েছে। পুনর্গঠিত ক্ষমতাকাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ। এতে বিপ্লবী গার্ডের শীর্ষ কমান্ডারদের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের মতো রাজনৈতিক নেতারাও রয়েছেন।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মোজতবা এসব শীর্ষ ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রয়েছে। তবে তার সঙ্গে সরাসরি ব্যক্তিগত যোগাযোগ রাখছেন মাত্র অল্প কয়েকজন কর্মকর্তা। তাকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাতে পারে—এমন আশঙ্কায় তার বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।
মোজতবার ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তার স্বাস্থ্যের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে এবং তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয় রয়েছেন।
যুদ্ধের আগেও মোজতবা প্রকাশ্য ভূমিকা এড়িয়ে চলতেন। তার বাবা আলী খামেনির শীর্ষ সহযোগী হিসেবে তিনি নেপথ্যে কাজ করতেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় তার বাবা নিহত হওয়ার সময় মোজতবাও আহত হন। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দাবি, ওই হামলায় তার মুখ বিকৃত হয়ে যায়।
তবে এখন দেশের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে থাকা মোজতবার দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষক ভাতানকার মতে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো সমঝোতা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত—দুটির ক্ষেত্রেই মোজতবার স্পষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন।
তার মতে, দীর্ঘদিন আড়ালে থাকায় একটি ‘বিপজ্জনক পরিস্থিতি’ তৈরি হয়েছে।

