ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনে অস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক ‘সহায়তা’ প্রদানের অভিযোগের বিষয়ে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবে জার্মানি। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) হেগের আদালতে অনুষ্ঠেয় শুনানিতে জার্মানির উত্থাপিত একটি প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা হবে। এই মামলাটি পরিচালনার এখতিয়ার আদালতের আছে কি না।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) এই মামলাটি দায়ের করেছে নিকারাগুয়া। তাদের অভিযোগ, বার্লিন ‘গণহত্যা বিষয়ক কনভেনশন’ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করছে। মামলাটি জার্মানিকে কেন্দ্র করে হলেও, এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিষয়টিও উঠে এসছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের হামলার জবাবে গাজায় গণহত্যা শুরু করে ইসরায়েল।
এই সংঘাতের ফলে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং গাজা উপত্যকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ১,৩০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এছাড়া পাঁচজন ইসরায়েলি সেনাও নিহত হয়েছেন। তবে ইসরায়েল বরাবরই গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ইসরায়েলের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী জার্মানি
কয়েক দশক ধরেই জার্মানি ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক এবং যুক্তরাষ্ট্রের পর ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। বার্লিন নিকারাগুয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জার্মানির আইনি দলের প্রধান তানিয়া ফন উসলার-গ্লাইশেন এর আগের এক শুনানিতে বিচারকদের বলেছিলেন, নিকারাগুয়ার দাবির ‘বাস্তবতা বা আইনের কোনো ভিত্তি নেই’।
গত বছর জার্মানি ইসরায়েলে এমন সব সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া বন্ধ করেছিল যা গাজায় ব্যবহৃত হতে পারত, তবে পরবর্তীতে সেই বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালে নিকারাগুয়া একটি জরুরি আবেদন জানিয়েছিল, যাতে আদালত জার্মানিকে গাজায় ইসরায়েলের জন্য সামরিক ও অন্যান্য সহায়তা বন্ধের নির্দেশ দেয়। আদালত সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেও ১৬ জন বিচারকের প্যানেল মামলাটি পুরোপুরি খারিজ করে দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
ফিলিস্তিনি জনগণের সাথে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে এমন একটি দেশের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে নিয়ন্ত্রণে আনার সর্বশেষ আইনি প্রচেষ্টা হলো এই কার্যক্রম। এর আগে ২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা একই আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনেছিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) বিচারকরা ইসরায়েলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তারা গাজায় মৃত্যু, ধ্বংসযজ্ঞ এবং যেকোনো ধরনের গণহত্যা প্রতিরোধে সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
এরপর দুই মাস পর আদালত ইসরায়েলকে গাজায় মানবিক পরিস্থিতির উন্নতির জন্য পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেয়; এর মধ্যে খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রবেশের সুবিধার্থে আরও স্থলপথ খুলে দেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
হেগ-ভিত্তিক আরেকটি আদালত ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত’ (আইসিসি) যা রাষ্ট্রগুলোর পরিবর্তে ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলার বিচার করে। সেখানে চলমান পৃথক এক আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারকরা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
এই দুজনের বিরুদ্ধে গণহত্যার নয়, বরং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালত জানিয়েছে, তাদের কাছে বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট কারণ রয়েছে, গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় ইসরায়েল মানবিক সহায়তা সীমিত করার মাধ্যমে ‘যুদ্ধকৌশল হিসেবে অনাহারকে’ ব্যবহার করেছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র আদালতের অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই তালিকায় আইসিসির ১৮ জন বিচারকের মধ্যে ৯ জন বিচারকও রয়েছেন।
সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।

