যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার নতুন অধ্যায়ে এবার ইরানের পানি অবকাঠামোতে হামলার অভিযোগ উঠেছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে দুটি পানি সংরক্ষণাগার ধ্বংস হয়েছে। এমন অভিযোগ সত্য হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এটিই হবে ইরানে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর প্রথম বড় ধরনের হামলা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, মানবিক ও কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘদিনের খরা ও পানিসংকটে ভুগতে থাকা ইরানের জন্য পানি অবকাঠামো এখন জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পর পাল্টাপাল্টি হামলা
গত মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়। ওয়াশিংটন এসব হামলাকে ‘আত্মরক্ষামূলক’ এবং ‘ইরানের আগ্রাসনের আনুপাতিক জবাব’ বলে বর্ণনা করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে হেলিকপ্টারটি গুলি করে ভূপাতিত করেছে। তবে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক তদন্ত তখনও শেষ হয়নি।
হামলার পর ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, সিরিক, জাস্ক, মিনাব, কেশম দ্বীপ এবং বন্দর আব্বাসসহ একাধিক এলাকায় মার্কিন হামলা চালানো হয়েছে। এতে সিরিক শহরের একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুটি পানি সংরক্ষণাগার ধ্বংস হয়েছে।
ইরানের সংবাদমাধ্যম ওয়েস্ট এশিয়া নিউজ এজেন্সি (ওয়ানা) জানিয়েছে, হরমোজগান প্রদেশের সিরিক কাউন্টির বামানি এলাকায় অবস্থিত দুটি কংক্রিটের পানি সংরক্ষণাগার হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল।
২০ হাজারের বেশি মানুষের পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত
ইরানি সূত্রগুলোর দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত পানি সংরক্ষণাগারগুলো কুহেস্তাক শহর এবং আশপাশের ১০টি গ্রামের ২০ হাজারেরও বেশি মানুষের পানীয় জলের প্রধান উৎস ছিল।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৭ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৮ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলারের মধ্যে হতে পারে।
স্থানীয় কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো দ্রুত মেরামত করা না গেলে ওই অঞ্চলের হাজারো মানুষ বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়তে পারেন।
আগে থেকেই তীব্র পানিসংকটে ইরান
ইরান বহু বছর ধরেই পানিসংকটের মুখোমুখি। যুদ্ধ শুরুর আগেই দেশটি দীর্ঘস্থায়ী খরা, বৃষ্টিপাত হ্রাস, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং দুর্বল পানি ব্যবস্থাপনার কারণে সংকটের মধ্যে ছিল।
বিশ্ব সম্পদ ইনস্টিটিউটের (ডব্লিউআরআই) অ্যাকুয়েডাক্ট ডেটা অনুযায়ী, ইরানের পানি চাপের মাত্রা ‘অত্যন্ত উচ্চ’ পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ দেশটি প্রতি বছর তার নবায়নযোগ্য পানিসম্পদের ৮০ শতাংশেরও বেশি ব্যবহার করে ফেলে।
২০২৫ সাল ছিল টানা পঞ্চম খরার বছর। একই বছরের নভেম্বরে রাজধানী তেহরানের নিকটবর্তী আমির কবির বাঁধে ধারণক্ষমতার মাত্র ৮ শতাংশ পানি অবশিষ্ট ছিল। দেশজুড়ে অন্তত ১৯টি বড় বাঁধ কার্যত শুকিয়ে গিয়েছিল।
পানি স্থাপনায় হামলা কি যুদ্ধাপরাধ?
ইরানের পানি শিল্পের মুখপাত্র ইসা বোজর্গজাদেহ দাবি করেছেন, পানি সংরক্ষণাগারে মার্কিন হামলা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে যুদ্ধাপরাধের শামিল।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থা, পানি শোধনাগার, পাইপলাইন এবং পানি সংরক্ষণাগারকে বেসামরিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত এসব স্থাপনা বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য হয় না।
আন্তর্জাতিক আইন সংস্থা (আইএলএ) প্রণীত এবং ২০০৪ সালে গৃহীত ‘বার্লিন রুলস অন ওয়াটার রিসোর্সেস’-এ বলা হয়েছে, যুদ্ধরত কোনও পক্ষ এমনভাবে পানি অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারবে না, যার ফলে সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপক ভোগান্তি নেমে আসে।
আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, পানি অবকাঠামোতে হামলার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে এটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। কারণ জ্বালানি ও সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি এখন বেসামরিক জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য অবকাঠামোও সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসছে।
তাদের মতে, এমন পরিস্থিতি শুধু মানবিক সংকটই বাড়াবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকেও আরও জটিল করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে পানিসংকটে জর্জরিত ইরানের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা

