মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নাটকীয় মোড়। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক সরে আসার সিদ্ধান্ত ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের স্বপ্নকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে দমনে ওয়াশিংটনের এই পিছুটান কেবল একটি যুদ্ধাবসানের গল্প নয়, বরং এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পুনর্গঠন করে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য তেল আবিব নির্ধারণ করেছিল, তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ নস্যাৎ হয়ে গেছে।
বিগত পঁচিশ বছরে আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন কিংবা লিবিয়ায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের চেনা ছকের চেয়ে ইরানের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে। সেখানে মার্কিন মদদে শাসনভার পরিবর্তনের চেষ্টা কেবল ব্যর্থই হয়নি বরং ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি এই সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব আরও জোরালোভাবে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। মূলত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ চুক্তির মাধ্যমে যে কৌশলগত ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করা হয়েছিল, সৌদি আরব তাতে সই করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত ট্রাম্পের হাত ধরেই নেতানিয়াহুর সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হলো।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আকস্মিক নীতি পরিবর্তন বা ‘ইউ-টার্ন’ মূলত মার্কিন অভ্যন্তরীণ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। আমেরিকার বাজারে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলের চড়া দাম এবং নিজের ক্রমাগত কমতে থাকা জনপ্রিয়তার গ্রাফ ট্রাম্পকে এই যুদ্ধ থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছে। তাছাড়া আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থবিরতা মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানছিল। ট্রাম্প চেয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার মতো একটি দ্রুত ও সহজ জয় কিন্তু ইরান যখন শুরুতেই কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তখন আশি বছর বয়সী এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধের মাঠ থেকে মানসিকভাবে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন।
ইসরায়েলের ভেতরে এই ঘটনাটিকে একটি ঐতিহাসিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং দেশটির সামরিক বিশ্লেষকরাও এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের একাংশের মতে, এই যুদ্ধের আগে মার্কিন সমর্থনে ইসরায়েলকে অঞ্চলের প্রধান সামরিক শক্তি মনে করা হতো কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ইরানই এখন সবচেয়ে প্রভাবশালী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নেতানিয়াহুর ঘোর সমালোচকরা এটিকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী দলগুলো এখন ‘একলা চলো’ নীতির কথা ভাবছে এবং নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার দাবি তুলছে।
হোয়াইট হাউজের এই সিদ্ধান্তের পর ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার সম্পর্কেও চরম ফাটল দৃশ্যমান হয়েছে। ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমের সামনে স্পষ্ট করেই বলেছেন, আমেরিকার সমর্থন ছাড়া ইসরায়েল দুই ঘণ্টাও টিকে থাকতে পারত না, তাই নেতানিয়াহুর উচিত তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। অন্যদিকে, ইসরায়েলের কট্টরপন্থী শিবিরের একাংশ ট্রাম্পের এই অবস্থানকে চরম বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছে এবং মার্কিন প্রশাসন ও মধ্যস্থতাকারীদের লক্ষ্য করে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে। কট্টর ডানপন্থীরা এখন ইরানের সরকারকে উৎখাত করতে নিজস্ব ও ‘সৃজনশীল’ উপায়ে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই নয় বরং ওয়াশিংটনের রাজনীতিতেও ইসরায়েলের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমেরিকার সাধারণ জনগণের মতামত এবং রাজনৈতিক প্রচারণায় এখন স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যেখানে ইসরায়েলকে একটি গণতান্ত্রিক ও নির্ভরযোগ্য সামরিক মিত্রের চেয়ে এক প্রকার রাজনৈতিক বোঝা হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়েছে। এমনকি মার্কিন কংগ্রেসের ওপর ইসরায়েলি লবির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়েও খোদ রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের ভেতরেই এখন দ্বিপাক্ষিক স্ক্রুটিনি ও সমালোচনা বাড়ছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ইসরায়েলি লবিস্টরা এখন মার্কিন আইনি কাঠামোয় জোরপূর্বক এমন কিছু ধারা যুক্ত করার চেষ্টা করছে যাতে ইসরায়েলের সামরিক সুবিধা চিরস্থায়ী করা যায়।
এই পুরো সংকট থেকে ইরান কৌশলগতভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। তারা তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি এবং শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র বহর অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছে, যা যেকোনো আক্রমণের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করেছে। একই সাথে লেবাননের হিজবুল্লাহসহ আঞ্চলিক প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর সাথে তেহরানের সম্পর্ক ও সমন্বয় আগের চেয়ে আরও বেশি সুদৃঢ় হয়েছে। এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে, ইরান কেবল তার মিত্রদের ব্যবহারই করে না বরং প্রয়োজনে তাদের সুরক্ষায় সরাসরি ঢাল হয়ে দাঁড়াতেও দ্বিধা করে না।
সামগ্রিক এই পরিস্থিতি এখন অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। আঞ্চলিক রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়া বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ফিলিস্তিনিদের ওপর আরও মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালাতে পারেন এবং গাজার বড় অংশ দখল করার চেষ্টা করতে পারেন। তবে গাজার দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ আন্দোলন এবং বিশ্বজুড়ে ইসরায়েল বয়কটের যে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে, তাতে ইসরায়েলের পক্ষে একা এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্য সত্যিই বদলে গেছে, তবে তা নেতানিয়াহুর কাঙ্ক্ষিত উপায়ে নয়; বরং ইসরায়েল এখন তার চিরচেনা সামরিক শক্তির সীমানায় এসে থমকে দাঁড়িয়েছে।
মিডলইস্ট আইঢয়ের বিশ্লেষণ

