কোরীয় যুদ্ধের আনুষ্ঠানিকভাবে অবসানের লক্ষ্যে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জায়ে-মিউ। শনিবার (১৫ আগস্ট) জাপানের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে কোরিয়ার স্বাধীনতা লাভের বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে লি এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেন, আসুন আমরা একে অপরকে হুমকি দেওয়ার মানসিকতা পরিহার করি এবং এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে সরাসরি সংশ্লিষ্ট পক্ষ হিসেবে আলোচনা শুরু করি। তিনি আরও বলেন, এর মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা করা সম্ভব হতে পারে।
লি এমন এক সময়ে এই প্রস্তাব দিলেন যখন উত্তর কোরিয়া আসন্ন বার্ষিক যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া যৌথ সামরিক মহড়ার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং আরও শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেন, দুই কোরিয়ার মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান প্রতিষ্ঠায় আলোচনার বিকল্প নেই। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির জন্য উত্তর কোরিয়া ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ প্রয়োজন।
১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে কোরীয় যুদ্ধের সক্রিয় সংঘাত বন্ধ হয়। তবে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। ফলে আইনগতভাবে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি এখনো হয়নি।
লি আরও বলেন, এর মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা করা সম্ভব হতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের এ অবস্থান গত বছর দেওয়া তার প্রতিশ্রুতিরই ধারাবাহিকতা। ওই সময় তিনি উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থাকে সম্মান জানিয়ে পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন।
তবে বাস্তবে দুই কোরিয়ার মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন দুই কোরিয়াকে এক করার নীতি থেকে সরে এসেছেন। তিনি দক্ষিণ কোরিয়াকে উত্তর কোরিয়ার ‘সবচেয়ে শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন।
অন্যদিকে জুলাই মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার একত্রীকরণ বিষয়ক মন্ত্রী দাবি করেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংসের জন্য তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের নীতি থেকে সিউল সরে এসেছে এবং এর পরিবর্তে পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক কার্যক্রমের বিস্তার রোধের ওপরই এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্ব ‘লি’-র বারবার দেওয়া প্রস্তাবের বিষয়ে এখনও কোনো সাড়া দেয়নি; বরং এর পরিবর্তে তারা রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সেনা ও গোলাবারুদ সরবরাহের বিনিময়ে পিয়ংইয়ং মস্কোর কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা, খাদ্য, জ্বালানি ও সামরিক প্রযুক্তি পাচ্ছে।
চলতি বছরের শেষের দিকে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন রাশিয়া সফর করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে; সম্ভবত মস্কোতে আরও অস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে আলোচনার জন্যই এই সফর হতে পারে। সিউলের প্রধান নিরাপত্তা মিত্র ওয়াশিংটন দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ২৮,৫০০ সেনা মোতায়েন করে রেখেছে, যাতে পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক হুমকি মোকাবিলায় দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ বাহিনীর কমান্ডের মুখপাত্র কর্নেল রায়ান ডোনাল্ড এই সপ্তাহে বলেছেন, ইউরোপের যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সেনা মোতায়েনের ফলে কোরিয় উপদ্বীপে তার বাহিনীর সদস্যদের সম্ভাব্য হুমকির ধরন বদলে গেছে।
এদিকে সোমবার শুরু হতে যাওয়া দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ১১ দিনব্যাপী যৌথ সামরিক মহড়া নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, তারা সেখানে যেসব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা সঙ্গে করে উত্তর কোরিয়ায় নিয়ে এসেছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রশিক্ষণে সেই হুমকির বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৫০ সালের ২৫ জুন উত্তর কোরিয়ার বাহিনী দক্ষিণ কোরিয়ায় সামরিক অভিযান শুরু করলে কোরীয় যুদ্ধের সূচনা হয়। সোভিয়েত নির্মিত ট্যাংক ও যুদ্ধবিমানসহ উত্তর কোরিয়ার বাহিনী দ্রুত দক্ষিণের দিকে অগ্রসর হয়। মাত্র তিন দিনের মধ্যে তারা দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল দখল করে নেয়।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ বাহিনী দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেয়। দীর্ঘ সংঘাতের পর ১৯৫৩ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। তবে শান্তিচুক্তি না হওয়ায় দুই কোরিয়া এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারেনি।
সূত্র: এএফপি।

