লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর আর্জেন্টিনার জন্য কতটা বড় শূন্যতা তৈরি করবে, তার হিসাব শুধু মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে করা কঠিন। দেশের অধিনায়ক, সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলারকে হারানোর পাশাপাশি আর্জেন্টিনা হারাচ্ছে আরও একটি বড় সম্পদ—বিশ্বজুড়ে তার সবচেয়ে মূল্যবান ক্রীড়া-বাণিজ্যিক মুখ।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) স্পন্সর, সম্প্রচারক ও প্রীতি ম্যাচের আয়োজকদের সামনে এমন এক আকর্ষণ হাজির করতে পেরেছে, যা অন্য কোনো জাতীয় দলের ছিল না। সেটি হলো আকাশী-সাদা জার্সিতে মেসি।
আর্জেন্টিনার বর্তমান দলেও জুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, লাউতারো মার্তিনেজদের মতো তারকা আছেন। কিন্তু মেসির মতো বিশ্বজুড়ে সমান বাণিজ্যিক আবেদন এখনো কারও নেই। তার নামই ছিল আর্জেন্টিনা দলের ব্র্যান্ডভ্যেলুর সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি।
এর প্রথম ধাক্কা আসবে জার্সি বিক্রিতে। মেসির নাম ও ১০ নম্বর লেখা আর্জেন্টিনার জার্সি শুধু দেশটির সমর্থকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বিশ্বের নানা প্রান্তে তা কিনতেন মেসিভক্তরা, যাদের অনেকেই আর্জেন্টিনার সমর্থকও নন। খুচরা জার্সি বিক্রির বড় অংশের অর্থ অবশ্য ক্রীড়া সামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাসের কাছে যায়। তবু মেসির কারণে তৈরি হওয়া বিপুল চাহিদা আর্জেন্টিনা ব্র্যান্ডকে আরও শক্তিশালী করেছে এবং স্পন্সরদের সঙ্গে চুক্তির আলোচনায় এএফএর অবস্থানও মজবুত করেছে।
অ্যাডিডাসের সঙ্গে এএফএর চুক্তি ২০৩৮ সাল পর্যন্ত। ফলে জার্সি থেকে বাণিজ্যিক আয়ের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সুরক্ষা থাকছে। কিন্তু ভবিষ্যতের নতুন স্পন্সরশিপ চুক্তি কিংবা ব্র্যান্ড-সম্পৃক্ত আলোচনায় মেসির ব্যক্তিগত প্রভাব আর কাজে লাগাতে পারবে না এএফএ।
সবচেয়ে দ্রুত এর প্রভাব পড়তে পারে প্রীতি ম্যাচের বাজারে। ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে ম্যাচ খেলে বড় অঙ্কের ফি আদায় করেছে। আয়োজকদের কাছে শুধু বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাই আকর্ষণ ছিল না; বড় আকর্ষণ ছিলেন মেসি। তার উপস্থিতি মানেই ছিল গ্যালারি পূর্ণ হওয়ার নিশ্চয়তা, টিকিটের দাম বাড়ানোর সুযোগ এবং স্পন্সরদের কাছ থেকে বেশি অর্থ আদায়ের সম্ভাবনা।
এর একটি বড় উদাহরণ অ্যাঙ্গোলা সফর। ২০২৫ সালের নভেম্বরে লুয়ান্ডায় আর্জেন্টিনার ম্যাচ আয়োজন করতে দেশটি ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার দেয়। কর কাটার পর এএফএর হাতে আসে প্রায় ৭০ লাখ ডলার। এক ম্যাচের জন্য অঙ্কটি ছিল বিশাল। সেই ম্যাচে মেসি গোলও করেন, সতীর্থকে দিয়ে গোলও করান; আর্জেন্টিনা জেতে ২-০ গোলে।
চীনের বেইজিংয়েও মেসির বাণিজ্যিক আকর্ষণ স্পষ্ট হয়েছিল। ২০২৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার প্রীতি ম্যাচের টিকিটের দাম উঠেছিল প্রায় ৬৮০ মার্কিন ডলার। এত বেশি দাম সত্ত্বেও দ্রুত বিক্রি হয়ে যায় সব টিকিট। মেসিকে ঘিরে এমন চাহিদার কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে আর্জেন্টিনার প্রীতি ম্যাচগুলো অন্য অনেক জাতীয় দলের চেয়ে আলাদা মূল্য পেয়েছে।
মেসির অবসরের প্রভাব এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে। আর্জেন্টিনার পরবর্তী এশিয়া সফর বাতিল হয়েছে, যার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল চুক্তির কেন্দ্রে মেসির উপস্থিতি। তার মতো আকর্ষণ না থাকলে আয়োজকেরা আগের মতো বিপুল অঙ্কের অর্থ দিতে কতটা আগ্রহী থাকবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আর্জেন্টিনা অবশ্য প্রীতি ম্যাচ থেকে আয় করতেই থাকবে। কিন্তু সেই অঙ্ক আগের পর্যায়ে থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। মেসি থাকলে আয়োজকেরা কয়েক শ ডলার পর্যন্ত টিকিটের দাম নির্ধারণ করেও দর্শক টানতে পারতেন। অন্য তারকাদের উপস্থিতিতে একই দামে টিকিট বিক্রি করে সেই চাহিদা ধরে রাখা অনেক কঠিন।

