বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে দলের পরাজয়ের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি। এমন পরিস্থিতিতে দলের আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে যুব দলের খেলোয়াড় এবং ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে অংশ নেওয়া জাতীয় দলের ওপর নিবিড় নজর রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
আনচেলত্তি বলেন, ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের জন্য বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেন বা শক্তিশালী ফ্রান্সের কৌশল অনুকরণ করার কোনো প্রয়োজন নেই ব্রাজিলের। কনফেডারেশনের জাদুঘরে যেখানে ব্রাজিলের জাতীয় দলের জেতা ট্রফিগুলোর বড় অংশ সংরক্ষিত আছে। সেখানে দাঁড়িয়ে আনচেলত্তি বলেন, আমাদের অনুকরণ করার প্রয়োজন নেই; বরং আমাদের বুঝতে হবে কোথায় উন্নতির সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, রক্ষণভাগ ও আক্রমণভাগের কিছু পজিশনে আমাদের দল বেশ সমৃদ্ধ। আমরা এখন মিডফিল্ডারদের ক্ষেত্রে উন্নতি ও বিকাশের দিকে নজর দিচ্ছি। আর খেলোয়াড় খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে অলিম্পিক একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে।
স্থানীয় সময় রবিবার ব্রাজিলে ফিরে আসার পর থেকেই আনচেলত্তি টোকিও অলিম্পিকের স্বর্ণপদক জয়ের ম্যাচটি নিয়ে অনেক কথা শুনেছেন। পাঁচ বছর আগে সেই ম্যাচে স্পেনকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে ব্রাজিল তাদের শিরোপা ধরে রেখেছিল। সেই ম্যাচে খেলা স্পেনের আটজন খেলোয়াড় এবং কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এখন বিশ্বকাপজয়ী; অথচ ব্রাজিল তাদের দল থেকে কেবল মিডফিল্ডার ব্রুনো গিমারেস এবং স্ট্রাইকার ম্যাথিউস কুনহাকেই ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য দলে নিয়েছে।
আনচেলত্তি বলেন, প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের চিহ্নিত করতে এবং তাদের অগ্রগতির ওপর নজর রাখতে আমরা অনূর্ধ্ব-১৫, অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-২০ দলের কোচদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি, যাতে তারা পরবর্তী বিশ্বকাপের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকতে পারে। চার বছর আগেও রায়ান অনূর্ধ্ব-১৭ দলে খেলছিল। এখন তরুণ খেলোয়াড়দের বিকাশের দিকে নজর দেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি, যাতে ২০৩০ সাল নাগাদ আমরা তার মতোই আরও এক প্রজন্মকে উঠে আসতে দেখি।
ব্রাজিলের অনেক সমর্থক হয়তো এতটা ধৈর্যশীল নন; তারা প্রায়শই আশা করেন, তারকারা জ্বলে উঠবেন এবং যেখানেই খেলবেন, সেখানেই তারা নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করবেন। কিন্তু আনচেলত্তি বলছেন, তিনি যে ধরনের কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন, তা এর চেয়ে ভিন্ন। ব্রাজিলের এই কোচ বলেন, এই মুহূর্তে ফুটবলে কোনো একজন নির্দিষ্ট তারকার প্রয়োজন নেই। আমাদের বরং দলীয় সংহতির ধারণাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। ব্রাজিলের এখন কোনো একক কেন্দ্রবিন্দু বা ‘রেফারেন্স পয়েন্ট’ নেই এবং তার প্রয়োজনও নেই। আমাদের অনেক দুর্দান্ত খেলোয়াড় আছে। আমাদের লক্ষ্য হলো একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল গড়ে তোলা।
সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুটি এবং অক্টোবরে ভারতের বিপক্ষে একটিসহ তিনটি প্রীতি ম্যাচের মধ্য দিয়ে ব্রাজিলের ইতিহাসে প্রথম পূর্ণকালীন বিদেশি কোচের নতুন অধ্যায় শুরু হবে। তিনি জানেন, ২০২৮ সালের কোপা আমেরিকা পর্যন্ত তার ওপর চাপের বিষয়টি বজায় থাকবে। আনচেলত্তির মতে, মহাদেশীয় টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া খেলোয়াড় এবং লস এঞ্জেলেসগামী তরুণ খেলোয়াড়দের সমন্বয়েই হয়তো ২০৩০ বিশ্বকাপের দল গঠিত হবে।
স্ট্রাইকার নেইমার যিনি ফিটনেস নিয়ে গুরুতর সংশয় থাকা সত্ত্বেও এই গ্রীষ্মের টুর্নামেন্টের জন্য আনচেলত্তির দলে জায়গা পেয়েছিলেন। তিনি বর্তমানে কোচের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নেই। ৩৪ বছর বয়সী এই তারকা চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে আবারও বলেছেন, জাতীয় দলের হয়ে তার সময় শেষ হয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন।
এ প্রসঙ্গে আনচেলত্তি বলেন, নেইমারের মতো একজন অসাধারণ প্রতিভার ক্ষেত্রে এটিই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। জাতীয় দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করার পর অন্যদের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটে। আমরা খুব কম সময় একসঙ্গে কাটিয়েছি, তবে তার সম্পর্কে আমার কেবল ভালো কথাই বলার আছে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক ও পেশাদার; সাধ্যমতো সবভাবেই তিনি সহায়তা করেছেন। দুর্ভাগ্যবশত চোটের কারণে প্রথম ম্যাচ থেকেই তিনি পুরোপুরি ফিট হয়ে খেলতে পারেননি।
আনচেলত্তি জানান, ২০৩০ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এবং ইতালীয় ফুটবল ফেডারেশনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে ‘চুক্তির কোনো সম্পর্ক নেই, এর সম্পর্ক হলো প্রতিশ্রুতির সঙ্গে’। ইতালীয় ফুটবল কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ওই পদের জন্য ব্রাজিলের কোচের কথাও বিবেচনায় ছিল; তবে শেষ পর্যন্ত সেই দায়িত্ব আবারও রবার্তো মানচিনির হাতেই ন্যস্ত করা হয়। ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন সবসময়ই আমাকে সমর্থন জুগিয়েছে, বিশেষ করে নরওয়ের কাছে সেই পরাজয়ের পর নিজের ক্রমশ উন্নত হতে থাকা পর্তুগিজ ভাষায় কথাগুলো বললেন কোচ।
তিনি একটি ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাপের মাধ্যমে ভাষা শিখেছেন। এখানকার মানুষের কাছ থেকে এ বছর যে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছি, তার কারণেই আমার মধ্যে এই দৃঢ় অঙ্গীকার কাজ করছে। ১৯৯৪ সালে ইতালির সহকারী কোচ হিসেবে ব্রাজিলের বিপক্ষে পেনাল্টি শুটআউটে বিশ্বকাপ ফাইনাল হারের অভিজ্ঞতা রয়েছে আনচেলত্তির। তবে তিনি বলছেন, এবারের হারটি তাকে আরও বেশি কষ্ট দিয়েছে; যদিও একই সঙ্গে এটি ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গিকেও নতুনভাবে উন্মোচিত করেছে।
এই পরাজয় মেনে নেওয়াটা কঠিন। ক্লাব ফুটবলে হারের বিষয়টি আমি সহজে হজম করতে পারতাম, কারণ সেখানে দ্রুতই সেই হারের বদলা নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু এখন আমাকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশিই এই পরাজয়ের কথা ভাবছি।
একই সঙ্গে অতীতের দিকে তাকিয়ে থাকার এবং ভবিষ্যতের দিকে নজর দেওয়ার মতো মানসিক শক্তি থাকতে হবে। দিন যত গড়াচ্ছে, অতীতের চেয়ে ভবিষ্যতের কথা নিয়েই আমি বেশি ভাবছি বলে জানান ব্রাজিলের কোচ।

