২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে অন্যতম আলোচিত বিষয়– সাকিব আল হাসানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন! জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর তার দেশে ফেরার ইতিবাচক আলোচনা হতে থাকে। কিন্তু সম্প্রতি গণঅভ্যুত্থানে পতিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হওয়ায় সাকিবের ফেরার বিষয়টি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তার বাড়িতে হামলা-মামলাসহ সব বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে।
গত বুধবার নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভার্চুয়ালি সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পক্ষেও যুক্তি দিয়েছেন সাকিব। ওই সংবাদ সম্মেলনের পর মাগুরায় তার ফাঁকা বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি শুধু শান্তি ও বাংলাদেশের অগ্রগতির আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং এ নিয়ে তার কোনো অনুশোচনা নেই।
সাকিব জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি আইনজীবীর মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র, আইন ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের কাছে তার ভাষায় ‘মনগড়া’ অভিযোগগুলো প্রত্যাহারের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু কোনো জবাব পাননি। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও সেসব বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী সাবেক এই অধিনায়ক।
ক্রিকেট প্রসঙ্গে সাকিব বলেন, অবসরের জন্য তিনি খুব বেশি অপেক্ষা করবেন না। তিনি জানান, ‘আমি এখনও বেশিরভাগ ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলছি। নিজের ভালো লাগছে, এখনও খেলাটা উপভোগ করছি, ভালোও খেলছি। কিন্তু… এই মুহূর্তে বয়স আর আমার পক্ষে নেই। তাই খুব বেশি অপেক্ষা করতে পারব না।’
এর আগে ২০২৪ সালের শেষদিকে একবার দেশে ফেরার পথে ছিলেন সাকিব। সেই প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে একবার অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তার আশ্বাসে তিনি দেশে ফেরার উদ্দেশে বিমানে উঠেছিলেন। বিমানবন্দরের লাউঞ্জ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ফোন করে যাত্রার বিষয়টি নিশ্চিতও করেন। কিন্তু যাত্রাপথেই তাকে ফিরে যেতে বলা হয়। পরে তিনি দুবাইয়ে নেমে সেখান থেকে নিউইয়র্কে ফিরে যান, যেখানে তিনি স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে লং আইল্যান্ডে বসবাস করেন।
সাকিবের দাবি– ১২ ঘণ্টার মধ্যে কী বদলে গেল, আমি জানি না। ওই সফরের পরিকল্পনা পাঁচ থেকে সাত দিন ধরে করা হয়েছিল। পরে আরও একবার দেশে ফেরার পরিকল্পনাও ভেস্তে যায় শেখ হাসিনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেওয়ার ঘটনায়। ওই সময় সেটিকেই তার দেশে ফেরায় বাধা দেওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। যা নিয়ে সাকিবের আক্ষেপ, ‘বাংলাদেশে ঢুকতে না দেওয়ার মানদণ্ড এটা কীভাবে হতে পারে, আমি বুঝি না।’
শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ থেকে দূরত্ব তৈরি করলে দেশে ফেরা সহজ হতে পারে– সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের এমন পরামর্শও প্রত্যাখ্যান করলেন সাকিব, ‘এটা বিবেচনা করার কোনো সুযোগই নেই।’ ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছিলেন, অন্য যেকোনো ক্রিকেটারের মতোই সাকিবকেও নিরাপত্তা দেওয়া হবে। তবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে জনরোষ কমাতে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বানও জানিয়েছিলেন তিনি।
সাকিব জানান, বর্তমানে তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা সক্রিয় রয়েছে। এর একটি গণঅভ্যুত্থানের সময় এক বিক্ষোভকারীকে হত্যার অভিযোগে, অন্যটি দুর্নীতি দমন কর্তৃপক্ষের করা ‘কথিত’ দুর্নীতির মামলা। তিনি বলেন, হত্যা মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল ২০২৪ সালের আগস্টের এমন এক দিনে, যেদিন তিনি কানাডার টরন্টোতে একটি ম্যাচ খেলছিলেন। তার মতে, ‘এটা হাস্যকর একটি মামলা।’ তবে এখনও তিনি কোনো আইনজীবী নিয়োগ দেননি বলেও জানান।
সাকিবের দাবি, তদন্তের নামে গত দেড় বছর ধরে তার ব্যাংক হিসাব জব্দ রয়েছে। তবে তিনি কোন কোন ব্যাংকে হিসাব রয়েছে বা কত অর্থ আটকে আছে, তা প্রকাশ করেননি। সাকিবের দাবি, ‘যে ব্যক্তি গত ১০ বছর ধরে দেশের সর্বোচ্চ করদাতা খেলোয়াড়দের একজন, সব কর পরিশোধ করেছে, তার হিসাব তদন্তের নামে দেড় বছর ধরে জব্দ রাখা হয়েছে। আপনারা যে তথ্য চাইবেন, আমি সব দেব। কিন্তু কিছুই না পেলে হিসাবগুলো ছেড়ে দিন।’
সাকিব আরও বলেন, গত দুই বছরে তিনি বাংলাদেশে থাকা তার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। তাদের দেশ ছাড়ারও অনুমতি দেওয়া হয়নি। সবার জন্যই সময়টা কঠিন ছিল দাবি করে সাকিব বলেন, ‘আমরা টিকে আছি।’

