বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম জালিয়াতি মামলার সাজাপ্রাপ্ত ভিয়েতনামের ব্যবসায়ী ট্রুং মাই ল্যানের জব্দ করা বিলাসবহুল গাড়ি, হ্যান্ডব্যাগ ও ইয়ট একের পর এক নিলামে তোলা হচ্ছে। তবে এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ বিক্রি করেও ভুক্তভোগী গ্রাহকদের পাওনা কোটি কোটি ডলারের কানাকড়িও শোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
একসময় ভিয়েতনামের অন্যতম শীর্ষ ধনী এই নারী ব্যবসায়ী এবং তার সহযোগীরা দেশটির একটি বড় ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করেছিলেন। এই অপরাধে ল্যানকে দুটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের একটি রায়ে ১২ বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। শর্ত ছিল, আত্মসাৎ করা অর্থের তিন-চতুর্থাংশ ফেরত দিতে পারলে তার সাজা কমতে পারে। ল্যানের জালিয়াতির বিশাল মাত্রা বিবেচনা করে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতেই আদালত তখন এই কঠোর রায় দিয়েছিল। তবে গত বছর ভিয়েতনাম সরকার আত্মসাৎসহ আটটি অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বিলুপ্ত করায় ল্যানের সেই সাজা কমে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরিত হয়। সাজা কমলেও ভুক্তভোগীদের পাওনা ২৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার লক্ষ্য থেকে তিনি এখনো অনেক দূরে রয়েছেন।
গত মে মাসে ল্যানের সংগ্রহে থাকা বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড হার্মিসের দুটি বারকিন হ্যান্ডব্যাগ অনলাইন নিলামে প্রায় ৫ লাখ ৩৯ হাজার ডলারে বিক্রি করা হয়। ল্যান নিজে ইতালি থেকে একটি ব্যাগ কিনেছিলেন এবং অন্যটি তাকে মালয়েশিয়ার এক ধনকুবের উপহার দিয়েছিলেন। ব্যাগ দুটি যেন তার সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে দেওয়া হয়, ল্যানের এমন আকুল আবেদন সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ তা নিলামে চড়ায়। এ ছাড়া গত মাসে তার তিনটি বিলাসবহুল গাড়িও নিলামের হাতুড়ির নিচে পড়ে। এর মধ্যে একটি চার আসনের সাদা মেবাখ গাড়ি প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়। অন্য দুটি গাড়ি ছিল একটি নীল বিএমডব্লিউ এবং একটি কালো লেক্সাস।
ল্যানের সাবেক আইনজীবী নগুয়েন থি হুয়েন ট্রাং সিএনএন-কে জানিয়েছেন, এই নিলাম থেকে প্রাপ্ত অর্থ প্রথমে আদালতের আইনি খরচ ও নিলাম প্রক্রিয়ার ব্যয় মেটাতে ব্যবহার করা হবে। ল্যান এখন পর্যন্ত মাত্র ৪ লাখ ৫৫ হাজার ডলার ফেরত দিতে পেরেছেন এবং হো চি মিন সিটির রায় বাস্তবায়ন সংস্থা তার অন্যান্য সম্পত্তি প্রক্রিয়াকরণ করছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ল্যানের ‘দ্য রেভারি সাইগন’ নামের একটি বিলাসবহুল ইয়ট প্রায় ২০ লাখ ডলারে নিলামে তোলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কোনো ক্রেতা না পাওয়ায় এর প্রারম্ভিক মূল্য ১৮ শতাংশ কমানো হয়েছে। এ ছাড়া তার আরও দুটি জাহাজও ক্রেতার অভাবে বিক্রি করা যায়নি। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ভিয়েতনামে সাধারণত জব্দ করা সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করা বেশ কঠিন এবং কিছু জিনিস ১০ বারের বেশি চেষ্টা করেও বিক্রি করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে ৬৯ বছর বয়সী ল্যান জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার আগে ভিয়েতনামে বিলাসবহুল বাড়ি ও বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেটের এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। তদন্তকারীরা জানান, তিনি শত শত ভুয়া কোম্পানি এবং সহযোগীদের মাধ্যমে ৪৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও নগদ অর্থ হাতিয়ে নেন এবং এই জালিয়াতি ঢাকতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বিপুল পরিমাণ ঘুষ দিয়েছিলেন। ১২ বিলিয়ন ডলারের জালিয়াতি মামলা ছাড়াও অবৈধ অর্থ পাচার, জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পত্তি দখল ও সীমানা পেরিয়ে অবৈধভাবে টাকা স্থানান্তরের অন্য আরেকটি মামলায় তাকে দ্বিতীয়বারের মতো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সূত্র: সিএনএন

