ভূমিকম্পের মতো বড়ো ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত প্রস্তুতি জোরদার করছে সরকার। এ লক্ষ্যে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন, ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় এক লাখ প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত করা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি বিশেষ সেল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি খাতে থাকা উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রপাতির একটি সমন্বিত তালিকাও প্রস্তুত করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বুধবার (২৯ জুলাই) অনুষ্ঠিত ভূমিকম্প প্রস্তুতি বিষয়ক বৈঠকের জন্য তৈরি ওই অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা গেছে, সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে ৪ হাজার ৮৬৯টি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে আরও ৭২৫টি ভারী যন্ত্রপাতি রয়েছে। সব মিলিয়ে জরুরি উদ্ধার অভিযানে ব্যবহারযোগ্য মোট ৫ হাজার ৫৯৪টি যন্ত্রপাতির তথ্য একত্র করেছে সরকার।
বুধবার বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি সাড়া, উদ্ধার অভিযান এবং বিভিন্ন সংস্থার সক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রে পাপ্ত তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, উদ্ধার অভিযানে ব্যবহারের জন্য সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কাছে ৫৩ ধরনের যন্ত্রপাতি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্রলার এক্সকাভেটর, হুইল এক্সকাভেটর, বুলডোজার, ডাম্প ট্রাক, মোবাইল ক্রেন, ফর্কলিফট, রোড রোলার, অ্যাম্বুলেন্স, জেনারেটর, স্পিডবোট, ওয়াটার ট্যাংকার, এয়ার কম্প্রেসর, লাইট টাওয়ার, রেসকিউ বোটসহ বিভিন্ন ভারী ও বিশেষায়িত সরঞ্জাম।
নথিতে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি রয়েছে জেনারেটর সেট (১,২৫৫টি)। এছাড়া ট্রাক রয়েছে ৪৯৭টি, ডাম্প ট্রাক ৪০৮টি, এয়ার কম্প্রেসার ৩৫৪টি, পাওয়ার ইউনিট (জেনারেটর) অ্যাসেম্বলি ৩৪৪টি, মিনি রোড রোলার ৩২৯টি, অ্যাম্বুলেন্স ১৯৭টি, স্পিড বোট ১৮৫টি এবং ক্রলার এক্সকাভেটর ১৬৮টি। তবে, তালিকায় অনুযায়ী-ভূমিকম্পের মতো ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যবহৃত ট্র্যাক লাডার, বাল্ক ক্যারিয়ার ট্রাক, ফুয়েল বাউজারের কোনো যন্ত্র সরকারের কাছে নেই।
তালিকায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার যন্ত্রপাতির হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সড়ক-মহাসড়ক, জ্বালানি ও সেতু বিভাগের আওতাধীন তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছেও ৭২৫টি ভারী যন্ত্রপাতি রয়েছে, যা প্রয়োজন হলে সরকারি উদ্ধার অভিযানে ব্যবহার করা যাবে। তবে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানান, বেসরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো চিঠি দিলেও তারা মন্ত্রণালয়কে কোনও তথ্য দেয়নি।
জাতীয় টাস্কফোর্স, এক লাখ স্বেচ্ছাসেবক
প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি শাহাদাৎ স্বাধীন পাঠানো এক বার্তায় জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে ভূমিকম্প মোকাবিলায় জাতীয় টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে এক লাখ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত করা, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
সভায় জানানো হয়, ইতোমধ্যে ৭০ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের ডাটাবেজ প্রস্তুত করা হয়েছে। দ্রুত আরও ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক অন্তর্ভুক্ত করে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিশেষ সেল
বৈঠকে ভূমিকম্প প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি বিশেষ সেল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি, ভূমিকম্প বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ এবং দুর্যোগের সময় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
এ ছাড়া রাজধানীতে মানবিক সহায়তা প্রস্তুতি ও অবস্থান কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। যাতে বড়ো ধরনের দুর্যোগের পর দ্রুত উদ্ধার সরঞ্জাম, ত্রাণ ও জনবল মোতায়েন করা সম্ভব হয়।
সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব মো. সাইদুর রহমান খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

