হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ে শুরু হয়েছিল যে বিপর্যয়, তার স্রোত থামেনি নেপালের সীমান্তবর্তী কয়েকটি জনপদে। বরং বরফ, পাথর ও পলির সঙ্গে নেমে আসা বিপুল পানি এক নদী থেকে আরেক নদীতে ছড়িয়ে পড়ে শেষ পর্যন্ত ভারতের বিহার পর্যন্ত পৌঁছানোর পথ তৈরি করেছে। নেপাল তিব্বত সীমান্তের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার এই প্রবাহ দেখিয়েছে, পাহাড়ি অঞ্চলের একটি ঘটনা কীভাবে পুরো নদী ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আল জাজিরার বিশ্লেষণ ও রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে নেপাল তিব্বত সীমান্তের পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও কাদাধস শুরু হয়। তীব্র স্রোতের সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে বিস্তীর্ণ এলাকা তছনছ করে দেয়।
এই বিপর্যয়ের কেন্দ্র ছিল সীমান্তের উঁচু হিমালয় এলাকা। স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ৫২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের নিচের অংশের বড় একটি অংশ ভেঙে প্রায় ১২০০ মিটার নিচে উপত্যকার তলায় পড়ে। নিচে নামার সময় বরফের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর ও পলি যুক্ত হয়।
এরপর সেই বরফ ও পাথরের ধস তিব্বতের লেন্দে নদীতে গিয়ে পড়ে। নেপাল চীন সীমান্তের প্রবেশপথ থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তরপূর্বে নদীর ওপর জমে থাকা ধ্বংসাবশেষ সাময়িকভাবে নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। এতে তৈরি হয় একটি প্রাকৃতিক বাঁধ।
কিছু সময় পর সেই বাঁধ ভেঙে গেলে আটকে থাকা পানি ও ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে ভাটির দিকে ছুটে যায়। সেখান থেকেই বিপর্যয়ের স্রোত আরও বিস্তৃত হতে থাকে।
লেন্দে নদীর এই প্রবাহ পরে লেন্দে খোলা হয়ে ভোতে কোশি নদীতে গিয়ে পড়ে। এরপর পানি প্রবেশ করে ত্রিশূলী নদীতে। মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায় বলে জানা গেছে।
নদীর এই প্রবাহ নেপালের রসুয়া জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আরও দক্ষিণে নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তীব্র স্রোতের সঙ্গে আসা পানি, কাদা ও পাথর বাড়িঘর, সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত করে।
রসুয়া জেলার তিমুরে ও স্যাপ্রু বেসি ছিল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে। পরে ত্রিশূলীর পানি নিচের দিকে নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বিস্তৃত এলাকায় বিপর্যয়ের প্রভাব দেখা যায়।
এই নদীপথের শেষ প্রান্তও গুরুত্বপূর্ণ। ত্রিশূলী নদী পরে নারায়ণী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। নারায়ণী এরপর ভারতের বিহারে প্রবেশ করে গণ্ডক নামে পরিচিত হয়। অর্থাৎ হিমালয়ের উঁচু এলাকায় শুরু হওয়া পানির এই প্রবাহ নেপালের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ভারতের নদী ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।
এদিকে বিপর্যয়ের ব্যাপকতায় নেপালে অন্তত ১৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তিব্বতে মারা গেছেন আরও তিনজন। দুই পাশে নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ১৫০০।
নেপালে ৮২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৬০০ জন বিদেশি পর্যটক। তিব্বতের গিয়িরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে।
উদ্ধারকাজে নেপালের সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাঁচ হাজারের বেশি সদস্য কাজ করছেন। হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করে নিখোঁজদের সন্ধান চলছে। তবে উঁচু নদীর পানি, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং কাদায় ঢেকে যাওয়া এলাকা উদ্ধার তৎপরতায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বিপর্যয়ের আরেকটি দিক হলো, নদীর প্রবাহের সঙ্গে ধ্বংসাবশেষের বিস্তার। পাহাড় থেকে নেমে আসা বরফ, পাথর ও পলি শুধু বন্যার পানির পরিমাণ বাড়ায়নি, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহেও সাময়িক পরিবর্তন তৈরি করেছে। ফলে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শুরু হওয়া একটি ঘটনা দ্রুত নিচের দিকের নদী ও জনপদে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাথমিকভাবে এই ঘটনাকে ভূমিকম্পের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস তাদের মূল্যায়ন সংশোধন করে জানায়, যে ভূকম্পন সংকেত পাওয়া গিয়েছিল সেটি আসলে ভূমিধস থেকেই তৈরি হয়েছিল। ভূমিধসটি পরে ৫ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূকম্পন হিসেবে রেকর্ড হয়।
দুর্যোগের পর এখন নেপাল ও তিব্বতের দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজ চলছে। তবে পাহাড়ি নদীর এই প্রবাহের বিস্তার আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, হিমালয়ের নদীগুলো পরস্পরের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত এবং উজানে ঘটে যাওয়া একটি বড় ঘটনা কীভাবে ভাটির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: আলজাজিরা

