আলামিন আসিফ :নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, তিনি বিভিন্ন ভবন, প্রকল্প ও নীতির সঙ্গে নিজের নাম জুড়ে দিচ্ছেন, কারণ তিনি চলে যাওয়ার পর আর কেউ তা করবেন না বলে মনে করেন।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনের সাংবাদিক বেন টেরিসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এমন মন্তব্য করেন। এর আগে ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফ মন্তব্য করেছিলেন, ট্রাম্প নিজের জন্য স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করছেন, কারণ অন্য কেউ তার হয়ে তা করতে চাইবে না।
ট্রাম্প ওই মন্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, ‘এটা সত্য। আমি চলে গেলে কেউ এটা করবে না। আমি এখান থেকে চলে যাওয়ার পর কেউ করবে না।’
ওয়াশিংটন ডিসিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে একের পর এক নির্মাণ ও সংস্কার প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক চলছে। এসব প্রকল্পের কিছুতে সরাসরি তার নাম যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, আবার কিছু প্রকল্পে তার ব্যক্তিগত পছন্দ ও নকশার ছাপ স্পষ্ট বলে সমালোচনা করছেন বিরোধীরা।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন ডিসি পুনর্গঠনের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে একাধিক মামলা চলছে। এর মধ্যে কেনেডি সেন্টার ও এর ক্যাম্পাসের নাম পরিবর্তন করে ট্রাম্পের নাম যুক্ত করার উদ্যোগও রয়েছে।
এ ছাড়া রাজধানীর একটি ঐতিহাসিক গলফ কোর্স সংস্কার এবং লিংকন মেমোরিয়াল রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কার ও ট্রাম্প রাজধানীতে ফ্রান্সের প্যারিসের আর্ক দ্য ত্রিয়ঁফের আদলে একটি বিশাল স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে বিভিন্ন ফেডারেল ভবনে টাঙানো বিশাল ব্যানারে ট্রাম্পের ছবি দেখা যাচ্ছে। বিচার বিভাগের সদর দপ্তরও এর মধ্যে রয়েছে। পররাষ্ট্র দপ্তর ‘প্যাট্রিয়ট পাসপোর্ট’ নামে একটি স্মারক পাসপোর্ট চালু করেছে, যাতে সংবিধানের সামনে ট্রাম্পের ছবি রয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের টাঁকশাল ট্রাম্পের মুখাবয়ব সংবলিত একটি স্মারক এক ডলারের মুদ্রাও প্রচলন করেছে।
শুধু স্থাপনা নয়, নিজের প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির সঙ্গেও ট্রাম্পের নাম যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস’, ‘ট্রাম্পআরএক্স’ এবং ‘ট্রাম্প গোল্ড কার্ড’। এক মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাসের দ্রুত সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে ওই গোল্ড কার্ডে।
এ ছাড়া মার্কিন সামরিক বাহিনী ‘ট্রাম্প-ক্লাস’ যুদ্ধজাহাজ তৈরির পরিকল্পনা করছে এবং ‘ইউএসএস ডোনাল্ড জে ট্রাম্প’ নামের একটি বিমানবাহী রণতরীর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ও ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর একটি হলো হোয়াইট হাউসের পূর্ব উইংয়ের জায়গায় বিশাল একটি বলরুম নির্মাণ। প্রকল্পটির জন্য পূর্ব উইংয়ের পুরোনো ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ৯০ হাজার বর্গফুটের এই স্থাপনার মধ্যে থাকবে বিলাসবহুল বলরুম। এর সঙ্গে একটি সামরিক কমপ্লেক্স, ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার এবং ছাদে ড্রোন পরিচালনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত নকশায় অভ্যন্তরে সোনালি মার্বেল, ঝাড়বাতি ও অন্যান্য সোনালি অলংকরণের পাশাপাশি ভবনের বাইরেও সোনালি আবরণের পরিকল্পনা দেখা গেছে।
ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ভবনটির সঙ্গে তার নাম যুক্ত করা হবে কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘হওয়া উচিত। জানি না হবে কি না, তবে হওয়া উচিত।’
প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনকে বলেন, ট্রাম্প তার বর্তমান মেয়াদেই প্রকল্পটি শেষ করতে চাইছেন। কারণ ভবনটি একবার তৈরি হয়ে গেলে পরবর্তী কোনো সরকার সহজে এটি সরিয়ে ফেলতে পারবে না।
প্রকল্পটি নিয়ে আদালতে আইনি লড়াই চলছে। সংরক্ষণবাদীরা ঐতিহাসিক স্থাপনার পরিবর্তন ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। তবে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনকে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। এদিকে প্রকল্পটির বৈধতা নিয়ে ফেডারেল বিচারকদের পাশাপাশি প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসও প্রশ্ন তুলেছেন।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভবনটি এত শক্তিশালী উপকরণ দিয়ে তৈরি হবে যে ভবিষ্যতে এটি ভেঙে ফেলা অত্যন্ত কঠিন হবে। তার তথ্য অনুযায়ী, এতে পারমাণবিক বিস্ফোরণ প্রতিরোধী উপকরণ ব্যবহার করা হবে।
তিনি বলেন, ভবনটির কাঠামোতে অত্যন্ত শক্তিশালী ইস্পাত ও এমন কংক্রিট ব্যবহার করা হবে, যা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও ব্যবহৃত হয়। পারমাণবিক হামলার পরিস্থিতি মোকাবিলার কথা মাথায় রেখেই এর নির্মাণ পরিকল্পনা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প এখন শুধু রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েই নয়, নিজের মৃত্যুর বিষয়েও আগের তুলনায় বেশি প্রকাশ্যে কথা বলছেন।
৮০ বছর বয়সী ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদ পার করছেন। একই সময়ে তার প্রশাসন বিভিন্ন তদন্ত ও সম্ভাব্য অভিশংসন প্রক্রিয়ার চাপের মুখেও রয়েছে।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে তার বিরুদ্ধে কয়েকটি কথিত হত্যাচেষ্টার ঘটনার পর নিজের জীবন ও মৃত্যুর বিষয়েও প্রকাশ্যে ভাবনার কথা বলেছেন তিনি।
গত বছর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার প্রসঙ্গে ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি সম্ভব হলে স্বর্গে যেতে চান। তার মতে, তিনি শুনছেন যে এ বিষয়ে তার অবস্থা ভালো নয়। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে পারলে সেটি স্বর্গে যাওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
সূত্র : দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউকে

