আসন্ন আলিম পরীক্ষার উত্তরপত্রে কোনো ধরনের অপ্রাসঙ্গিক বা আপত্তিকর লেখা লিখলে, কিংবা বিশেষ কোনো সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র সরাসরি বাতিল করা হবে। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড আইন ২০২০ অনুসারে প্রকাশিত ‘আলিম পরীক্ষা পরিচালনা নীতিমালা-২০২৬’-এ পরীক্ষা সংক্রান্ত জালিয়াতি ও বিশৃঙ্খলা রোধে এমন কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৫ জুন) বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড আইন ২০২০ অনুসারে আসন্ন আলিম পরীক্ষা সুষ্ঠু, বৈষম্যহীন ও সুশৃঙ্খলভাবে আয়োজন করতে পরীক্ষা পরিচালনা নীতিমালা প্রকাশ করা হয়েছে। এই নীতিমালায় শিক্ষার্থীর প্রার্থিতা, ফরম পূরণের যোগ্যতা, প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্র কমিটির কর্মকর্তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য নিয়ে একগুচ্ছ কঠোর ও স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বোর্ডের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা আলিম ১ম বর্ষে ভর্তির পর নির্ধারিত শিক্ষাবর্ষের ৩১ মার্চের মধ্যে অবশ্যই রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী একই রেজিস্ট্রেশনের অধীনে স্ব-স্ব মাদ্রাসা থেকে ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ ৪ বার আলিম পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে বোর্ডের আগের অনুমোদন ছাড়া অন্য কোনো মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়া বা কোনো অবৈধ শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিলে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার অধ্যক্ষ দায়ী থাকবেন এবং তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর পাস করার পর রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ থাকলে শিক্ষার্থীরা পরবর্তী বছরে জিপিএ উন্নয়নের জন্য পরীক্ষা দিতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো, চতুর্থ বিষয় ছাড়া কোনো পরীক্ষার্থী জিপিএ-৫ এর কম পেলেই কেবল এই সুযোগ পাবেন এবং এই পরীক্ষা সর্বোচ্চ একবারই দেওয়া যাবে। জিপিএ উন্নয়ন পরীক্ষার্থীদের জন্য নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক নয় এবং প্রাইভেট ও এক/দুই বিষয়ে পাস করা শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ পাবেন না।
প্রাইভেট ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ নিয়ম
নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রাইভেট পরীক্ষার্থীদেরও ২০২৬ সালের নতুন পাঠ্যসূচি অনুযায়ী নির্ধারিত মাদ্রাসার মাধ্যমে এবং নির্ধারিত কেন্দ্রেই পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে, কোনো অবস্থাতেই কেন্দ্র পরিবর্তন করা যাবে না। প্রাইভেট পরীক্ষার্থীরা কেবল সাধারণ ও মুজাব্বিদ মাহির বিভাগে পরীক্ষা দিতে পারবেন এবং চতুর্থ বিষয়সহ ব্যবহারিক পরীক্ষা আছে এমন কোনো বিষয় তারা গ্রহণ করতে পারবেন না। এছাড়া দাখিল পরীক্ষার মূল একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট এবং নম্বরপত্র প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা বা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দ্বারা সত্যায়িত করে বোর্ডে জমা দিতে হবে। শিক্ষক এবং পুলিশ বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রার্থীদের ক্ষেত্রে চাকুরির নির্দিষ্ট মেয়াদ ও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সার্টিফিকেটের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ থাকা পর্যন্ত অনুত্তীর্ণ বা অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে বাধ্য থাকবেন প্রতিষ্ঠান প্রধানেরা।
বোর্ড জানিয়েছে, কেবল বৈধ রেজিস্ট্রেশনধারী শিক্ষার্থীরাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনলাইনে আবেদন ফরম পূরণ করতে পারবেন। অনলাইনে পূরণ করা ই-এসআইএফের তথ্যে কোনো গরমিল থাকলে এবং তার জন্য ফল প্রকাশে জটিলতা তৈরি হলে বোর্ড দায়ী থাকবে না, বরং প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষার্থী দায়ী থাকবেন। ভুয়া রেজিস্ট্রেশন প্রমাণিত হলে পরীক্ষা চলাকালে বা ফল প্রকাশের পরও পরীক্ষা বাতিল করা হবে। উত্তরপত্রের কভার পৃষ্ঠার ওএমআরে শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় তথ্য বৃত্ত ভরাট করার সুবিধার্থে পরীক্ষা শুরুর ১০ মিনিট আগে উত্তরপত্র বিতরণ করা হবে এবং পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে বিষয় বা পত্রের কোড নম্বর বলে দেওয়া যাবে। উত্তরপত্রের ওএমআরে কোনো ত্রুটি থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন উত্তরপত্র ব্যবহার করতে হবে। উত্তরপত্রের কোনো অংশে অপ্রাসঙ্গিক, আপত্তিজনক লেখা বা বিশেষ কোনো সাংকেতিক চিহ্ন থাকলে সেই উত্তরপত্র সরাসরি বাতিল বলে গণ্য হবে বলেও জানানো হয়েছে।
‘মেঘনা’ ও ‘যমুনা’ সেটের প্রশ্ন পৃথক রাখার নির্দেশ
প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধ এবং গোপনীয়তা বজায় রাখতে নীতিমালায় কঠোর পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রশ্নপত্র সর্টিং করার পর ‘মেঘনা’ সেটের প্রশ্নপত্র অবশ্যই ‘মেঘনা’ সেটের ট্রাংকে এবং ‘যমুনা’ সেটের প্রশ্নপত্র ‘যমুনা’ সেটের ট্রাংকে আলাদাভাবে লক করে রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এই দুই সেটের প্রশ্নপত্র একত্রে একই ট্রাংকে রাখা যাবে না। প্রশ্নপত্রের সিলগালা করা ট্রাংক যে কক্ষে সংরক্ষণ করা হবে, সেখানে অবশ্যই ‘ডাবল লক কী’ বা দ্বৈত চাবি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। জেলা ও উপজেলা ট্রেজারি বা থানা লকার থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহের সময় কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একা যেতে পারবেন না। প্রশ্নপত্র সংগ্রহের সময় জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কর্তৃক মনোনীত ট্যাগ অফিসার এবং পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পরীক্ষা শুরুর নির্ধারিত সময়ের অনধিক ১৫ মিনিট আগে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কক্ষপ্রত্যবেক্ষকদের কাছে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করবেন। পরীক্ষা শুরুর আগে এসএমএসের মাধ্যমে নির্দেশনা পাওয়ার পর তিন জন কক্ষপ্রত্যবেক্ষকের সামনে প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খুলতে হবে এবং প্যাকেটের ওপর সময় ও তারিখ উল্লেখ করে প্রত্যয়ন করতে হবে।
পরীক্ষা কেন্দ্রের আইনশৃঙ্খলা ও আসন বিন্যাসে কড়া নির্দেশনা
পরীক্ষাকেন্দ্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে জেলা সদরে জেলা প্রশাসক এবং উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাদেরকে জেলা শিক্ষা অফিসার এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার সহায়তা প্রদান করবেন। কেন্দ্র সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় হলে মাদ্রাসার অধ্যক্ষই তত্ত্বাবধায়ক কর্মকর্তা হবেন। যেসব কেন্দ্রে সাধারণ মানুষের অনুপ্রবেশের বা বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা থাকবে, তার চারপাশে ২০০ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করে লোকজনের একক বা দলবদ্ধ চলাচল নিষিদ্ধ করা যাবে। পরীক্ষা কক্ষের আসন বিন্যাসে প্রতি ছয় ফুট লম্বা বেঞ্চে সর্বোচ্চ ২ জন পরীক্ষার্থী বসার ব্যবস্থা করতে হবে এবং বেঞ্চে রোল চিরকুট আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিতে হবে। পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশপত্র, রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও জ্যামিতি বক্স ছাড়া মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা কোনো প্রকার কাগজপত্র আনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি অসদুপায় হিসেবে গণ্য হবে। কোনো পরীক্ষার্থীকে নকল করতে বা অন্য কারও উত্তরপত্রে তাকাতে দেখা গেলে তাকে সরাসরি বহিষ্কার করা যাবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, পরীক্ষা শুরুর প্রথম দিন ১ ঘণ্টা আগে এবং পরবর্তী দিনগুলোতে ৩০ মিনিট আগে হলের দরজা খুলে দেওয়া হবে। পরীক্ষা শুরুর ১৫ মিনিট আগে একটি সতর্ক ঘণ্টা বাজবে এবং পরীক্ষা শুরুর নির্ধারিত মুহূর্তে প্রশ্নপত্র বিতরণের জন্য আরেকটি ঘণ্টা বাজানো হবে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর ১ ঘণ্টা অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো পরীক্ষার্থী উত্তরপত্র দাখিল করে হল ত্যাগ করতে পারবেন না। প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে যেতে হলেও পরীক্ষা শুরুর ১ ঘণ্টার আগে অনুমতি দেওয়া হবে না এবং যাওয়ার আগে উত্তরপত্র ও প্রশ্নপত্র কক্ষপ্রত্যবেক্ষকের নিকট জমা দিয়ে যেতে হবে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর কক্ষপ্রত্যবেক্ষক কর্তৃক উত্তরপত্র সংগ্রহ না করা পর্যন্ত কোনো পরীক্ষার্থী আসন ত্যাগ করতে পারবেন না। যদি কোনো পরীক্ষার্থী উত্তরপত্র জমা না দিয়ে কক্ষ ত্যাগ করে চলে যায়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে থানায় জিডি করে পুলিশের সহায়তায় উত্তরপত্র উদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বোর্ডে প্রতিবেদন পাঠানো হবে।
এছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, সেলেব্রাল পালসি জনিত প্রতিবন্ধী এবং যাদের হাত নেই) পরীক্ষার্থীদের জন্য বোর্ডের অনুমতি সাপেক্ষে ১০ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শ্রুতিলেখক সঙ্গে নেওয়ার নিয়মও রাখা হয়েছে।

