পাকিস্তানের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ রশিদ আহমেদের একটি বক্তব্য ঘিরে দেশটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এক জনসমাবেশে নিষিদ্ধ জঙ্গিগোষ্ঠী লস্কর-ই-তাইয়েবার (এলইটি) প্রতিষ্ঠাতা ও জাতিসংঘের তালিকাভুক্ত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হাফিজ সাঈদের প্রশংসা করে নিজেকে তার ‘গোলাম’ বা সেবক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন তিনি। একই অনুষ্ঠানে ভারতকে নিয়েও হুমকিমূলক বক্তব্য দেন পাকিস্তানের এই সাবেক মন্ত্রী।
শেখ রশিদ আহমেদ পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। বর্তমানে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল আওয়ামি মুসলিম লীগের (এএমএল) প্রধান। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তাকে লস্কর-ই-তাইয়েবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে একই মঞ্চে দেখা যায়।
ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর ভারতের বিরুদ্ধে তার হুমকি এবং হাফিজ সাঈদের প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্যের বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে।
আমি হাফিজ সাঈদের গোলাম
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় শেখ রশিদ আহমেদ হাফিজ সাঈদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে বলেন, “আমি হাফিজ সাহেবের গোলাম।”
এরপর তিনি দাবি করেন, তার মোবাইল ফোনে হাফিজ সাঈদের ফোন নম্বর পাওয়া যাওয়ায় তাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।
তবে এ দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনও প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
হাফিজ সাঈদ পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তাইয়েবার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার মূল পরিকল্পনাকারীদের একজন হিসেবে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চিহ্নিত। জাতিসংঘও তাকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
সাঈদের নেতৃত্বাধীন লস্কর-ই-তাইয়েবা ভারতে একাধিক সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িত বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে।
ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকি
বক্তব্যের একপর্যায়ে ভারতকে উদ্দেশ করে শেখ রশিদ আহমেদ বলেন, ভারত যদি ‘পাকিস্তানের দিকে তাকায়’, তাহলে আল্লাহ দেশটিকে ধ্বংস করে দেবেন।
তিনি আরও বলেন, “ভারতে কোনও পাখি ডাকবে না, কোনও মন্দিরে ঘণ্টা বাজবে না।”
এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ভারতে কোনও ধরনের পাকিস্তানবিরোধী কর্মকাণ্ড সংঘটিত হতে পারবে না বলেও দাবি করেন।
সমাবেশে তিনি বলেন, “আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে, আমরা হাফিজ সাঈদের সঙ্গে।”
তার এই বক্তব্য পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অবস্থান এবং দেশটির মাটিতে সক্রিয় জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
লস্কর নেতাদের সঙ্গে একই মঞ্চে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে শেখ রশিদকে লস্কর-ই-তাইয়েবার জ্যেষ্ঠ কমান্ডার এবং পাকিস্তান মারকাজি মুসলিম লীগের (পিএমএমএল) সভাপতি খালিদ মাসুদ সান্ধুর সঙ্গে একই মঞ্চে দেখা যায়।
সেখানে ক্বারি মুহাম্মদ ইয়াকুব শেখ নামের আরেক ব্যক্তিকেও দেখা যায়, যিনি ওই জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লস্কর-ই-তাইয়েবার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে সংগঠনটির প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ বহুদিনের। পাকিস্তানে সংগঠনটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিসরে সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে।
শেখ রশিদের মতো একজন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে একই মঞ্চে উপস্থিতি তাই বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সমালোচকেরা।
কে এই শেখ রশিদ আহমেদ?
শেখ রশিদ আহমেদ পাকিস্তানের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ইমরান খানের সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। যদিও তিনি নিজস্ব রাজনৈতিক দল আওয়ামি মুসলিম লীগের নেতৃত্ব দেন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে তিনি ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবেই পরিচিত।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় তার বিভিন্ন বক্তব্য ও মন্তব্য পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে শুরু করে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক পর্যন্ত নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
২৬/১১ হামলা নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য
সন্ত্রাসবাদ নিয়ে শেখ রশিদের বিতর্কিত মন্তব্য অবশ্য নতুন নয়।
২০২২ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তিনি দাবি করেছিলেন, ২০০৮ সালের মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার অন্যতম হামলাকারী আজমল কাসাবের পাকিস্তানের ফারিদকোটের ঠিকানা ভারতকে জানিয়েছিলেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ।
সেসময় পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তার এই মন্তব্য সামনে আসে। ইমরান খান তখন দাবি করেছিলেন, বিদেশি শক্তিগুলো তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। সেই রাজনৈতিক বয়ানকে জোরালো করতে তৎকালীন বিরোধীদের ‘ভারতপন্থী’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
আজমল কাসাব ছিল ২০০৮ সালের ২৬/১১ মুম্বাই হামলায় অংশ নেওয়া একমাত্র জীবিত হামলাকারী। ওই হামলায় ১৬৬ জন নিহত হয়।
সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ফের প্রশ্নের মুখে পাকিস্তানের পুরোনো অবস্থান
শেখ রশিদের সাম্প্রতিক বক্তব্য পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদবিষয়ক নীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে।
ইসলামাবাদ বরাবরই পাকিস্তানের মাটিতে সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্রের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। দেশটির সরকার প্রায়ই এসব সংগঠনকে ‘অরাষ্ট্রীয় শক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তবে ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সীমান্তপারের হামলা চালিয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে তারা দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর কিছু অংশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন পেয়েছে।
লস্কর-ই-তাইয়েবা এ বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রীয় সংগঠন।
হাফিজ সাঈদকে ঘিরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, ২৬/১১ মুম্বাই হামলার অভিযোগ এবং পাকিস্তানে তার সংগঠনের কর্মকাণ্ড নিয়ে বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে। ফলে একজন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে নিজেকে হাফিজ সাঈদের ‘গোলাম’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া এবং তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা পাকিস্তানের সরকারি অবস্থানের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ- সে প্রশ্নই এখন নতুন করে উঠেছে।
বিশেষ করে একই অনুষ্ঠানে লস্কর-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি এবং ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকি দেওয়ার বিষয়টি দুই দেশের দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শেখ রশিদের বক্তব্যকে তাই শুধু একজন রাজনীতিকের বিতর্কিত মন্তব্য হিসেবে নয়, পাকিস্তানের রাজনীতি, উগ্রবাদী গোষ্ঠী এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে চলমান বিতর্কের আরেকটি উদাহরণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সূত্র: এনডিটিভি

