বিদেশে পড়তে যাওয়া নিয়ে ভয়াবহ বিপাকে পড়েছেন ভারতীয় শিক্ষার্থীরা। ভিসা নিয়ে কড়াকড়ি ও ভারতীয় রুপির দরপতনে এ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত কয়েক মাসে ইউরোসহ বিশ্বের প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে ভারতীয় রুপির ব্যাপক দরপতন হয়েছে। এতে করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাঋণের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে গেছে। সোমবার (২২ জুন) ব্রিটিশ সংবাদমাাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ভারতের ঝাড়খণ্ডের ২৯ বছর বয়সী কন্টেন্ট ক্রিয়েটর প্রগতি প্রিয়া ইউরোপের একটি দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, চিন্তায় আমার রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। আমি এমন কোনো ঋণের বোঝা কাঁধে নিতে চাই না, যা সারা জীবনেও শোধ করা সম্ভব হবে না।
প্রিয়ার মতো ভারতের লাখ লাখ মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থী একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন। ২০২৫ সালের তথ্য বলছে, ১২ লাখেরও বেশি ভারতীয় শিক্ষার্থী বর্তমানে বিদেশে পড়াশোনা করছেন। দেশটি কয়েক বছর আগেই এ ক্ষেত্রে চীনকে ছাড়িয়ে শীর্ষ অবস্থান দখল করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রুপির ক্রমাগত অবমূল্যায়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে চাকরির অনিশ্চয়তা এবং ভিসার কঠোর নিয়মের কারণে এ অবস্থান ধরে রাখা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
ভারতের এডওয়াইজ ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির প্রতিষ্ঠাতা সুশীল সুখওয়ানি বলেন, বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। গত দুই বছরে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ শতাংশ কমেছে। আগামীতে এ হার আরও ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমতে পারে।
ভিসা কড়াকড়ির কারণেও অনেক শিক্ষার্থীর বিদেশে পড়াশোনা দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের জানুয়ারির সেশনে যুক্তরাজ্যের ৭৬ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই হার প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে।
রুপির দরপতনের কারণে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। সুখওয়ানি জানান, গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে রুপির মান ১০ শতাংশের বেশি কমেছে। এতে করে অনেক শিক্ষার্থীকে টিউশন ফির জন্য নতুন করে ঋণের আবেদন বা অতিরিক্ত অর্থের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০১৯ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান পরিস্থিতি বিভিন্ন দেশের মুদ্রার বিপরীতে ভারতের মুদ্রার মান ৩৫ থেকে ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
অন্যদিকে পড়াশোনা শেষে চাকরি করে আয় বাড়লেও ক্যারিয়ার গঠনের পথ দিন দিন সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘নর্থ আমেরিকা অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টসের’ প্রতিষ্ঠাতা সুধাংশু কৌশিক বলেন, শিক্ষার্থীরা দক্ষকর্মী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে আসেন। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত গিগ ইকোনমি বা অস্থায়ী বা খণ্ডকালীন কাজে আটকে পড়ছেন। আগে এসব কাজ করে পড়াশোনার খরচ মেটাতে পারলেও এখন তারা শেষ পর্যন্ত পূর্ণকালীন হকার বা ডেলিভারি বয় হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।
তিনি বলেন, পেশা নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা ভারতের উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা কমিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া বিদেশে পড়াশোনাও আগের চেয়ে ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।
স্টুডেন্ট আবাসন বিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ‘ইউনিভার্সিটি লিভিংয়ের’ চিফ অপারেটিং অফিসার মায়াঙ্ক মাহেশ্বরী বলেন, কম টিউশন ফি, পড়াশোনা পরবর্তী কাজের সুবিধা এবং ভালো কর্মসংস্থানের কারণে জার্মানি, আয়ারল্যান্ড ও ইতালির মতো দেশগুলো এখন ভারতীয় শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
সূত্র: বিবিসি

