আলামিন আসিফ :নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার ওহাইওতে এক নির্বাচনি সমাবেশে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে অশালীন ভাষায় আক্রমণের পাশাপাশি মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা জয়ী হলে রাজ্যটিকে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একইসঙ্গে ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে ওহাইওর সঙ্গে কম সহযোগিতা করারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। খবর রয়টার্সের।
রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনে আয়োজিত সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘শুধু ভোট দিতে বের হন। এটা করলে আমরা জিতব, বড় ব্যবধানে জিতব এবং তাদের পেছনে ঠেলে দেব।’
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে দেশজুড়ে বেশ কয়েকজন ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান সিনেটর কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে রয়েছেন। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্যে জ্বালানি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে চলায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কমেছে। ওহাইওতে সিনেটর জন হাস্টেড ও গভর্নর প্রার্থী বিবেক রামাস্বামী দুজনই ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। হাস্টেডের প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সিনেটর শেরড ব্রাউন এবং রামাস্বামীর প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যামি অ্যাকটন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা অগ্রগতি করতে পারে বলে বিভিন্ন জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, সমালোচকদের ধারণার চেয়ে রিপাবলিকানরা ভালো করবে।
ওহাইওর ভ্যান্ডালিয়ায় সমবেত জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় আমরা বড় ধরনের চমক দেখাতে যাচ্ছি। কারণ তারা জানে না কী ঘটতে যাচ্ছে।’
ওহাইওর সিনেট নির্বাচন দেশটির ৮টি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের একটি। ডেটা সেন্টার নির্মাণ এবং তরুণদের লিঙ্গ পরিবর্তনসংক্রান্ত অস্ত্রোপচারের মতো সাংস্কৃতিক ইস্যু নিয়েও রাজ্যটিতে নির্বাচনি বিতর্ক তীব্র হয়েছে।
সমাবেশে ট্রাম্প বারবার ডেমোক্র্যাটদের আক্রমণ করেন। একপর্যায়ে তাদের ‘বুদ্ধিহীন’ বলে গালি দেন। তিনি বলেন, রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকলে ওহাইওর কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার প্রশাসনের সরাসরি যোগাযোগ থাকবে এবং রাজ্যটির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তা পাওয়া সহজ হবে।
ট্রাম্প বলেন, ওহাইওর নির্বাচিত রিপাবলিকান কর্মকর্তারা রাজ্যের জন্য অর্থ চেয়ে নিয়মিত তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে তাদের সহায়তা করার ব্যাপারে তিনি কম আগ্রহী থাকবেন বলে জানান। অ্যামি অ্যাকটনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমি তাকে সাহায্য করব না।’
হাস্টেড এমন ভোটারদেরও ভোটকেন্দ্রে আনতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করছেন, যারা সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দিতে যান না। একইসঙ্গে তিনি দীর্ঘদিনের ডেমোক্র্যাট নেতা শেরড ব্রাউনেরও সমালোচনা করেন।
সমাবেশে হাস্টেড বলেন, ‘তিনি ৫০ বছর ধরে দায়িত্বে আছেন। আপনার জন্য তিনি কী করেছেন, একটি বিষয়ও কি বলতে পারেন?’
ব্রাউনের প্রচারশিবিরের এক মুখপাত্র ট্রাম্পের ইরান নীতির প্রতি হাস্টেডের সমর্থনের সমালোচনা করেন। পাশাপাশি ওহাইওতে ডেটা সেন্টার আকর্ষণে হাস্টেড ‘করপোরেশন ও বিলিয়নিয়ারদের জন্য বিশেষ সুবিধার করচুক্তি’ সমর্থন করেছেন বলেও অভিযোগ করেন।
রয়টার্সকে ই-মেইলে ব্রাউনের মুখপাত্র লরেন চৌ বলেন, ‘জন হাস্টেড প্রতিবারই করপোরেশন ও বিলিয়নিয়ারদের অগ্রাধিকার দেন, আর এর খরচ আমাদের সবাইকে দিতে হয়।’
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ওহাইওতে ৫৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে এরপর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে তার জনপ্রিয়তা কমেছে।
অটোমোবাইল ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহকারী সংস্থা এএএ-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ওহাইওতে গ্যাসোলিনের দাম ৩৫ শতাংশ বেড়ে গড়ে প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ১৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। কানাডার সঙ্গে ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে আরোপ করা কানাডীয় শুল্কে ওহাইওর প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে ২০২৫ সালের তথ্যের ভিত্তিতে কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ডেটা সেন্টার নিয়ে বিতর্ক
শনিবারের সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার আগে সাংবাদিকদের হাস্টেড বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান যুদ্ধে ‘নিজেদের শর্তে’ জয়ী হতে হবে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, এর মধ্যবর্তী সময়ে তিনি ‘মানুষকে দেখাচ্ছেন যে কম দামের জন্য লড়াই করছেন।’
সমাবেশে হাস্টেড সমর্থকদের কাছ থেকে জোরালো সাড়া পেলেও তার বার্তা পৌঁছাতে হচ্ছে স্বাধীন ভোটারদের কাছেও।
১৯ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক ও স্বতন্ত্র ভোটার জনাথন স্মিথ ভ্যান্ডালিয়ার একটি সাবেক উচ্চবিদ্যালয়ের বাইরে ‘আমার কম দামের গ্যাস কোথায়?’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছিলেন।
স্মিথ বলেন, ‘আমাকে বিয়ের জন্য টাকা জমাতে হচ্ছে। আর গ্যাসের দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকায় টাকা আলাদা করে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’ সিনেট নির্বাচনে কাকে ভোট দেবেন, তা এখনও ঠিক করেননি বলেও জানান তিনি।
ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের নথি অনুযায়ী, ওহাইওতে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও গোষ্ঠী কয়েক কোটি ডলার ব্যয় করেছে। ফলে হাস্টেড-ব্রাউন প্রতিদ্বন্দ্বিতা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় ব্যয়বহুল সিনেট নির্বাচনি লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
এদিকে ওহাইওতে ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে সমাবেশে উপস্থিত ভোটারদের মধ্যে মিশ্র মতামত পাওয়া গেছে।
২০ বছর বয়সী স্যামুয়েল ক্লিভেঞ্জার বলেন, ‘আমি এআই ডেটা সেন্টার নিয়ে খুব একটা আগ্রহী নই।’ তবে ট্রাম্পের ওহাইওর প্রতি মনোযোগ এবং ২০২৫ সালে ওভারটাইম আয়ের ওপর কর কমানোর নীতিতে উৎসাহিত হয়ে তিনি ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান এই শিক্ষানবিশ প্লাম্বার।
অন্যদিকে সমাবেশস্থলের বাইরে ৬০ বছর বয়সী ব্রেন্ডা হোয়াইট উত্তর-পূর্ব ওহাইওর নিজের এলাকায় ডেটা সেন্টার নির্মাণের পক্ষে একটি প্ল্যাকার্ড ধরে ছিলেন। তাতে লেখা ছিল, ‘সাউথ লোরেইনে ডেটা সেন্টার চাই।’
হাস্টেড যখন দর্শকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন হোয়াইট তাকে একটি স্টিল মিলের পরিবর্তে ওই এলাকায় ডেটা সেন্টার নির্মাণে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান।
হোয়াইটের দিকে তাকিয়ে হাস্টেড প্রশ্ন করেন, ‘আপনি সেখানে ডেটা সেন্টার চান?’
হাস্টেডের সঙ্গে ছবি তোলার আগে তার সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তি হোয়াইটকে জিজ্ঞেস করেন, ‘প্ল্যাকার্ডটি ছাড়া কি এটা করা যায়?’
সূত্র : রয়টার্স

