ফেসবুক থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ভিডিও সাময়িকভাবে সরিয়ে ফেলার ঘটনায় মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গকে তিনদিনের মধ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে বলেছে ভারত।
দেশটির সংসদীয় যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত কমিটি এই আল্টিমেটাম দেয়।
একই সঙ্গে ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় মেটার ‘সেফ হারবার’ বা আইনি সুরক্ষা সুবিধা বাতিল করে জাকারবার্গের বিরুদ্ধে মামলা করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে কমিটি।
বিজেপি সংসদ সদস্য নিশিকান্ত দুবের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত কমিটির ভাষ্য, ১৪০ কোটির বেশি ভারতীয় নাগরিকের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভিডিও সরিয়ে ফেলার ঘটনা ‘গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত’।
কমিটি জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মেটা যদি দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয় এবং মার্ক জাকারবার্গ আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা না চান, তাহলে কোম্পানির ‘সেফ হারবার’ বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাওয়া আইনি সুরক্ষা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হবে। সেক্ষেত্রে জাকারবার্গের বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা করার পথও উন্মুক্ত হতে পারে।
ভারতে ‘সেফ হারবার’ সুবিধা বাতিল হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো আপত্তিকর কনটেন্টের দায় থেকে আর আইনি সুরক্ষা পাবে না। তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি এফআইআর দায়ের করতে পারবে।
নিশিকান্ত দুবে অভিযোগ করেন, মেটা দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাওয়া বিশেষ আইনি সুবিধার অপব্যবহার করে আসছে।
তিনি বলেন, “আমরা তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি, প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও সরিয়ে ফেলা কোনো মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়; এটি একজন প্রকাশকের মতো আচরণ। তাই মার্ক জাকারবার্গকে আগামী তিন দিনের মধ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। অন্যথায় মেটার ‘সেফ হারবার’ সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করা হবে।”
দুবে আরও বলেন, “যদি এই ধরনের কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা দেশজুড়ে মেটা প্রধানের বিরুদ্ধে একাধিক এফআইআর দায়ের করা শুরু করেন, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে এবং দায়ীদের আইনি পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।”
গত ২৩ জুলাই ভারতের রাজধানী দিল্লিতে তরুণ প্রজন্ম বা জেন-জি’র উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি সেলফি ভিডিও প্রথমে ইনস্টাগ্রাম এবং পরে ফেসবুকে প্রকাশ করেন। প্রশ্নফাঁসবিরোধী সরকারের কঠোর অবস্থান তুলে ধরা ওই ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
তবে পরবর্তীতে ফেসবুকে ভিডিওটির প্রবেশাধিকার সাময়িকভাবে সীমিত করে মেটা। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে অল্প সময়ের মধ্যেই ভিডিওটি আবার সচল করা হয়।
এই ঘটনার জেরে মেটার কর্মকর্তাদের ইতোমধ্যে সংসদীয় কমিটির মুখোমুখি হতে হয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে তাদের দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
মেটা ঘটনাটিকে ‘প্রযুক্তিগত ত্রুটি’ বলে ব্যাখ্যা দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেও ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সেই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, যদি এটি সত্যিই প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে হয়ে থাকে, তাহলে মেটার মতো একটি শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের উচিত দ্রুত তাদের অ্যালগরিদম ও কনটেন্ট ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা সংস্কার করা।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী মোদির ভিডিও বিতর্ক ছাড়াও ইনস্টাগ্রামের বিজ্ঞাপনে শিশু যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত কনটেন্ট প্রদর্শনের অভিযোগে মেটা ইতোমধ্যেই ভারতের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। গত মাসে এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশও পাঠানো হয়।
বুধবার সংসদীয় যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত কমিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে ভারতের শিশু সুরক্ষাবিষয়ক আইন কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
কমিটির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এই সতর্কবার্তা গুগল, ইউটিউব, এক্স (সাবেক টুইটার), ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম এবং স্ন্যাপচ্যাটসহ সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য।
কমিটির চেয়ারম্যান নিশিকান্ত দুবে বলেন, “ভারতে শিশু যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্ট কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নারীদের ভুয়া ও অশ্লীল ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া গুরুতর অপরাধ। এটি দেশের সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ বিষয়ে কোনও ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।”
সূত্র: এনডিটিভি

