গাজায় ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞের মধ্যে দুই স্বামী ও দুই সন্তানকে হারিয়ে এক ফিলিস্তিনি নারীর জীবনসংগ্রাম ও বেদনার কাহিনি তুলে ধরেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। মধ্য গাজার নুসেইরাতের ৩৪ বছর বয়সী নারী নিসরিন তৌমান কীভাবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিজের পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ট্র্যাজেডি প্রত্যক্ষ করেছেন, সংবাদ প্রতিবেদনে তা বিস্তারিত ফুটে উঠেছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে নুসেইরাতে নিজের স্বামী সামি এবং দুই সন্তান মাহমুদ ও লাইথকে নিয়ে সুখী ও স্থিতিশীল জীবনযাপন করছিলেন নিসরিন। তবে ২০২৪ সালের ৮ জুন হঠাৎ তাদের জীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। সেদিন খান ইউনিসের আল-মাওয়াসিতে আত্মীয়দের সাথে দেখা করে ফেরার পরপরই নুসেইরাতে তীব্র বোমাবর্ষণ এবং গুলিবর্ষণ শুরু হয়। আকাশ থেকে যুদ্ধবিমান চক্কর দেওয়ার মধ্যে ৩৩ বছর বয়সী সামি রাজপথ থেকে সন্তানদের এবং স্বজনদের ঘরে ফিরিয়ে আনতে বাইরে বের হন। কিন্তু এরপরই কোয়াডকপ্টার থেকে চালানো গুলিতে মাথায় আঘাত পেয়ে সামি নিহত হন। এর কয়েক মিনিট পর তাদের বাড়িটি লক্ষ্য করে সরাসরি বিমান হামলা চালানো হয়। ধুলো ও ধোঁয়ার মেঘ কাটতেই নিসরিন দেখতে পান চারদিকে রক্ত ও শরীরের বিচ্ছিন্ন অংশ ছড়িয়ে রয়েছে। সেদিন পাঁচ ও দুই বছর বয়সী দুই সন্তানকে নিথর অবস্থায় পান তিনি। হামলায় এক সন্তানের মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছিল এবং অন্যজনকে দেখে মনে হচ্ছিল সে ঘুমিয়ে আছে। নিসরিন যখন কোনো কথা বলতে পারছিলেন না, তখন তার দেবর সন্তান দুটিকে তার কোলে তুলে দেন। পরবর্তী দুই ঘণ্টা তিনি বোমা আর গুলির শব্দের মধ্যে নিথর দুই সন্তানকে কোলে চেপে ধরে বসে ছিলেন। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির সহায়তায় অবশেষে তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সেই দিনটি ছিল গাজা যুদ্ধের অন্যতম রক্তক্ষয়ী দিন। ইসরায়েলি বাহিনী ৪ জন জিম্মিকে উদ্ধার করতে নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে চার ঘণ্টাব্যাপী ব্যাপক অভিযান চালায়। এতে ৮৯টি বসতবাড়ি ধ্বংস হয় এবং অন্তত ২৭৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত ও ৬৯৮ জন আহত হন। সেদিন নিসরিনের স্বামী ও দুই সন্তান ছাড়াও তার বোন সাবরিন, শাশুড়ি, দুই দেবর এবং তাদের সন্তানসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্য নিহত হন।
স্বজন হারানোর ভয়াবহ ট্র্যাজেডির চার সাড়ে চার মাস পর নিসরিন এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন। তার প্রয়াত বোনের স্বামী, যিনি নিসরিনের প্রথম স্বামীর ভাই; তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন, যেন তিনি তার বোন হারিয়ে যাওয়া চার মাতৃহীন সন্তানের দেখাশোনা করতে পারেন। শুরুতে রাজি না হলেও এক বছর বয়সী ছোট ভাগ্নেসহ অন্যান্য সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে নিসরিন এই বিয়েতে সম্মতি দেন। এই বিবাহিত জীবন মূলত ছিল পরস্পরের ক্ষতি পূরণের এক সামাজিক চেষ্টা। কিন্তু আট মাস পর, ২০২৫ সালের ৮ জুলাই আবারও ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসে। সকালে নাশতা সেরে বের হওয়ার কিছু পরেই নুসেইরাতের আল-আওদা হাসপাতালের কাছে ইসরায়েলি হামলায় নিসরিনের দ্বিতীয় স্বামী মোহাম্মদ নিহত হন।
দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যুর সময় নিসরিন গর্ভবতী ছিলেন। এর চার মাস পর তাদের কোলজুড়ে আসে এক কন্যাসন্তান, যার নাম রাখা হয় সিদ্রে। সন্তান জন্ম নেওয়ার আনন্দ নিসরিনের জীবনের গভীর ক্ষতকে পুরোপুরি ঢাকতে পারেনি। তিনি জানান, নতুন করে মা হওয়া তাকে কিছুটা সান্ত্বনা দিয়েছে ঠিকই কিন্তু সেই আনন্দ ছিল একদমই অসম্পূর্ণ।
বর্তমানে নিসরিন তার কন্যা সিদ্রে কে নিয়ে গাজায় নিজের পৈতৃক বাড়িতে বসবাস করছেন। অন্যদিকে তার বোনের চার সন্তান তাদের নানার তত্ত্বাবধানে রয়েছে, যেখানে নিসরিন মাঝে মাঝেই দেখা করতে যান। ধারাবাহিক এই ট্র্যাজেডির ভয়াবহতা স্মরণ করে নিসরিন বলেন, কখনো কখনো মনে হয় যেন কোনো সিনেমার গল্পে বসবাস করছেন কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতা এতটাই নির্মম যে সেখানে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাই ঘটে যেতে পারে। জীবনের সব হারিয়ে তিনি এখন সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিয়েছেন নিজেকে এবং তার একমাত্র অগ্রাধিকার এখন ছোট মেয়ে সিদ্রে কে বড় করে তোলা।
সূত্র: আল জাজিরা

