দীর্ঘ ২৮ বছরের খরা কাটিয়ে অবশেষে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ফিরছে নরওয়ে। স্বাভাবিকভাবেই পুরো জাতি এখন তাকিয়ে আছে ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আর্লিং হালান্দের দিকে। উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিতব্য এই বিশ্বকাপে নরওয়েকে নিয়ে বাজি ধরছেন অনেকেই। তবে যারা ভাবছেন নরওয়ে মানেই শুধু হালান্ড, তারা মস্ত বড় ভুল করছেন। কোচ স্টেল সোলবাকেন এবার এমন এক সুসংহত দল গড়ে তুলেছেন, যা কেবল একজন তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়। হালান্ডের কাঁধে গোলের মূল দায়িত্ব থাকলেও তাকে যোগ্য সঙ্গ দিতে প্রস্তুত একঝাঁক প্রতিভাবান সহযোদ্ধা।
বাছাইপর্বে আট ম্যাচের সবকটিতে গোল করে মোট ১৬ বার জাল কাঁপিয়েছেন ২৫ বছর বয়সী হালান্ড। এর মধ্যে মলদোভার বিপক্ষে একাই পাঁচ গোল এবং ইসরায়েলের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক রয়েছে। কিন্তু একজন স্ট্রাইকার তখনই সফল হন, যখন তিনি পেছন থেকে সঠিক জোগান পান। আর এই জায়গাতেই নরওয়ে এবার বেশ শক্তিশালী। উইংয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে চুরমার করতে প্রস্তুত আরবি লাইপজিগের ২১ বছর বয়সী উইঙ্গার আন্তোনিও নুসা। বাছাইপর্বে ইতালির বিপক্ষে দলের বড় জয়ে গোল ও অ্যাসিস্ট করে নিজের জাত চিনিয়েছেন এই তরুণ। বাম প্রান্তে ব্যাক-আপ হিসেবে থাকছেন বেনফিকার আরেক চমক ২২ বছর বয়সী আন্দ্রেয়াস শিয়েলদারুপ, যিনি জোসে মরিনহোর অধীনে দুর্দান্ত ফর্মে আছেন।
ডান প্রান্তে আতলেতিকো মাদ্রিদের সাড়ে ছয় ফুট উচ্চতার স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার সরলথকে উইঙ্গার হিসেবে খেলিয়ে চমক দেখাতে পারেন কোচ। আক্রমণভাগের এই বৈচিত্র্য নরওয়ের অন্যতম বড় অস্ত্র। এছাড়া ফুলহামের অস্কার বব এবং বোদো-গ্লিমতের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ম্যান সিটি ও ইন্টার মিলানকে স্তব্ধ করে দেওয়া জেন্স পেটার গেও দলে গভীরতা বাড়িয়েছেন। মিডফিল্ডেও নরওয়ের শক্তি কোনো অংশে কম নয়। আর্সেনালকে প্রিমিয়ার লিগ জেতানো অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড আছেন মাঝমাঠের মূল দায়িত্বে।
ইনজুরির কারণে বাছাইপর্বের তিনটি ম্যাচ মিস করলেও ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৭টি অ্যাসিস্ট এসেছে ওডেগার্ডের পা থেকেই। ওডেগার্ডের দূরদর্শিতা আর পাসিংয়ের ওপরই নির্ভর করছে হালান্দের গোল পাওয়া। মাঝমাঠে তাকে সাহায্য করতে থাকছেন ফুলহামের সান্দার বার্গ এবং অবসর ভেঙে দলে ফেরা বেনফিকার অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার ফ্রেডরিক আউর্সনেস।
যদি কোনো কারণে হালান্দকে মাঠের বাইরে থাকতেও হয়, তাহলেও নরওয়ের চিন্তার কিছু নেই। দলে আছেন ক্রিস্টাল প্যালেসের দুর্দান্ত স্ট্রাইকার জর্গেন স্ট্র্যান্ড লারসেন, যিনি প্রীতি ম্যাচে সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোল করে নিজের ফর্মের জানান দিয়েছেন। পাশাপাশি সরলথ তো আছেনই, যিনি আতলেতিকো মাদ্রিদের হয়ে গত মৌসুমে ২০টি গোল করেছেন। তবে নরওয়ের সবচেয়ে বড় গোপন অস্ত্র হতে পারেন বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের রাইট-ব্যাক জুলিয়ান রিয়ারসন। সরলথ যখন ভেতরে ঢুকে খেলবেন, তখন পুরো ডান প্রান্ত ধরে ঝড় তোলার দায়িত্ব থাকবে রিয়ারসনের ওপর। গত বুন্দেসলিগা মৌসুমে তার ১৮টি অ্যাসিস্ট এবং সেট-পিস থেকে দারুণ সব ক্রস প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের জন্য বড় মাথা ব্যথার কারণ হবে।
ফ্রান্স, সেনেগাল এবং ইরাকের মতো কঠিন প্রতিপক্ষের সাথে ‘গ্রুপ অব ডেথ’-এ পড়েছে নরওয়ে। তবে কোচ সোলবাকেন আত্মবিশ্বাসী। ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়ে দেশের ফুটবল ভক্তদের আবেগের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। মাইনাস চার ডিগ্রি তাপমাত্রার মধ্যেও হাজার হাজার সমর্থক যেভাবে দলকে অভিনন্দন জানাতে এসেছিলেন, তাতেই স্পষ্ট ফুটবল নিয়ে দেশটির উন্মাদনা। কোচ মনে করেন, তারা হয়তো পুরো টুর্নামেন্ট জয়ের ফেভারিট নন কিন্তু নিজেদের দিনে বিশ্বের যেকোনো শক্তিশালী দলকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য এই দলটির আছে। ব্যক্তিগত নৈপুণ্য আর দলীয় কঠোর পরিশ্রমের মিশেলে নরওয়ে এবার কেবল অংশগ্রহণ করতেই যাচ্ছে না, বরং উত্তর আমেরিকার মাটিতে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় লিখতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
সূত্র: গোলডটক

