বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ আয়ের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির প্রস্তাব ঘিরে বিশ্ব ফুটবলে সৃষ্ট বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে।
ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা এবার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে যে, তারা ফিফাকে একটি ‘ডকুমেন্ট প্রিজারভেশন লেটার’ বা প্রমাণ সংরক্ষণের আইনি নোটিস পাঠিয়েছে।
এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য আইনি প্রক্রিয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সব নথি, ই-মেইল ও তথ্য সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে পাঠানো এক ই-মেইলে উয়েফা জানায়, “আমরা নিশ্চিত করছি যে, একটি ডকুমেন্ট প্রিজারভেশন লেটার পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে আপাতত এর বেশি কোনও মন্তব্য করা হবে না।”
এ ধরনের আইনি নোটিস সাধারণত সম্ভাব্য মামলা, সালিশি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থায় অভিযোগের আগে পাঠানো হয়, যাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষ কোনও প্রাসঙ্গিক তথ্য বা নথি নষ্ট বা পরিবর্তন করতে না পারে।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
৪২০ কোটি ডলারের পরিকল্পনা ঘিরে বিতর্ক
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো গোপনে ভবিষ্যৎ বিশ্বকাপের আয় থেকে অংশীদারিত্ব বিক্রি করে প্রায় ৪২০ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছিলেন। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এবং জোশুয়া কুশনারের প্রতিষ্ঠানের নামও আলোচনায় আসে।
প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত গত শনিবার ইনফান্তিনো পরিকল্পনাটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন।
উয়েফার কঠোর অবস্থান
বিতর্ক সামনে আসার পর উয়েফা সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নেয়। গত বৃহস্পতিবার সংস্থাটির ৫৫ সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা জরুরি বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত নেন, পরিকল্পনাটি কার্যকর থাকলে তারা ফিফার সব প্রতিযোগিতা ও কার্যক্রম বয়কট করবেন।
খবর অনুযায়ী, ইনফান্তিনো পরিকল্পনা প্রকাশ করার পর থেকেই উয়েফা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছিল।
সম্ভাব্য আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, নিউইয়র্কভিত্তিক আইন প্রতিষ্ঠান ডেকার্টের মাধ্যমে পাঠানো চিঠিতে উয়েফা জানিয়েছে, তারা ফিফার প্রস্তাবিত ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ প্রকল্প এবং সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে মামলা, সালিশি কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থায় অভিযোগ করার সম্ভাবনা সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।
চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, নোটিস পাওয়ার পর কোনও প্রাসঙ্গিক নথি ধ্বংস, মুছে ফেলা, পরিবর্তন বা গোপন করা হলে তা প্রমাণ নষ্ট করার শামিল হিসেবে গণ্য হতে পারে।
জানা গেছে, ওই নোটিসে ফিফার ১৮ জন শীর্ষ কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা থমাস পেয়ার এবং ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট প্রধান ও সাবেক কিংবদন্তি কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার।
তবে ওয়েঙ্গার পরে এক বিবৃতিতে দাবি করেন, ইনফান্তিনোর এ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি আগে কিছুই জানতেন না।
ইনফান্তিনোর বিকল্প খুঁজছে উয়েফা
এদিকে সুইডিশ ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছে, আগামী মার্চে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা সভাপতি নির্বাচনের জন্য উয়েফা ইতোমধ্যে বিকল্প প্রার্থী খোঁজার কাজ শুরু করেছে।
গত শনিবার উয়েফা এক বিবৃতিতে জানায়, ইনফান্তিনো বিশ্ব ফুটবলের আস্থা হারিয়েছেন এবং তার নেতৃত্বের অবসান ঘটানোর বিষয়ে ‘কোনও বিকল্পই আলোচনার বাইরে নয়’।
কী ছিল বিতর্কিত প্রস্তাব?
ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফিফার বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও বিশ্বকাপসহ প্রধান টুর্নামেন্টের আয় ব্যবস্থাপনা ২০৩৮ সাল পর্যন্ত একটি পৃথক প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হতো।
ফিফার মূল্যায়নে এ প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য মূল্য ছিল ২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। এর বিনিময়ে সদস্য ২১১টি ফেডারেশনকে এককালীন প্রতি ফেডারেশন ২ কোটি ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এ প্রস্তাব গ্রহণের জন্য সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।
ফিফার দাবি ছিল, এর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর উন্নয়ন তহবিল দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানো সম্ভব হবে।
তবে ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন লামোর এক বিবৃতিতে জানান, পুরো প্রকল্পটি মূলত ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছিল এবং সংস্থার অনেক কর্মকর্তা নিজেদের প্রতারিত মনে করেছেন।
বিশ্ব ফুটবলে বিভক্তি
ইনফান্তিনোর এ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে সরব অবস্থান নেয় উয়েফা। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এবং উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল সংস্থা কনকাকাফও প্রকাশ্যে আপত্তি জানায়।
অন্যদিকে আফ্রিকার বেশির ভাগ ফুটবল ফেডারেশন এখনও ইনফান্তিনোর পক্ষে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ আমেরিকার কনমেবলও ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ ৪৮ থেকে বাড়িয়ে ৬৪ দলে আয়োজনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে ইনফান্তিনোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করছে। এতে আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ে আরও বেশি ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ পাবে।
পুনর্নির্বাচন নিয়েও অনিশ্চয়তা
মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও ধারণা করা হচ্ছিল, আগামী মার্চে মরক্কোয় অনুষ্ঠিত ফিফা সভাপতি নির্বাচনে ইনফান্তিনো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চতুর্থ ও শেষ মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হবেন।
কিন্তু বিতর্কিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ফিফা আগে দাবি করেছিল, তাদের ২১১ সদস্য ফেডারেশনের মধ্যে প্রায় ২০০টির সমর্থনপত্র ইনফান্তিনোর হাতে রয়েছে।
তবে এখন ইউরোপের বিভিন্ন ফুটবল ফেডারেশন সেই সমর্থন প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিচ্ছে। ওয়েলস ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ইতোমধ্যেই নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে।
আগামী ১৮ নভেম্বর ফিফা সভাপতি নির্বাচনের জন্য প্রার্থিতা জমা দেওয়ার শেষ দিন। চার মাস পর মরক্কোয় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে এখন বিশ্ব ফুটলে জোর আলোচনা চলছে।
সূত্র: আল-জাজিরা

