সিরাজগঞ্জের সন্তান ভাষা সৈনিক ডা. আলী আজমল বুলবুল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের এক মহান সংগঠক ও প্রথম সারির বীর সেনানী, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘বুলবুল ডাক্তার’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ১৯২৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার পাড়কোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
ইতিহাসের অমর স্বাক্ষর বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের এক লড়াকু সৈনিক ডা. আলী আজমল বুলবুল। মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবীতে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী যাঁরা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে উদ্দীপ্ত হয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন ও গ্রে*প্তার হন এবং দীর্ঘসময় কারা*বরণ করেন, তাঁদের প্রথম দশজনের একজন ডা. আলী আজমল বুলবুল।
পিতার চাকুরী সুত্রে আজমলের লেখাপড়া শুরু হয় রাজশাহীতেই। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। এই উভয় পরীক্ষাতেই তিনি অভিভক্ত বাংলায় কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সম্মিলিত মেধা তালিকায় যথাক্রমে ১৩তম এবং ১১ তম স্থান লাভের অসাধারণ গৌরব অর্জন করেন। অতঃপর ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় স্থান লাভ করে কোলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর মাইগ্রেশন সার্টিফিকেট নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চলে আসেন তিনি। তিনি যেমন ছিলেন মেধাবী, তেমনি নেতৃত্ব দানের ছিল অসাধারণ যোগ্যতা। ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র-সংসদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসাবে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রশ্নে ১৯৪৮ সালে ছাত্র সমাজ ছিল বিক্ষুদ্ধ। সে বছর হরতাল চলাকালে ঢাকা সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং এবং ২ নং গেটে পিকেটিং করার সময় প্রথম পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন আজমল। সেই থেকে ৫২ এর ২১ শে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত মোট ১১ বার কারাবরণ করেন এবং ১৭ বার পুলিশের তালিকায় মোষ্ট ওয়ান্টেড তালিকায় আসামি হিসাবে নাম ওঠে তাঁর। এসব কারনে কর্তৃপক্ষ তাঁকে মেডিকেল কলেজ থেকে বহিস্কার করেন। ফলে তাঁর আর এম.বি.বি.এস পাশ করা হয়নি।
১৯৫৪ সালে আলী আজমল নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। গ্রামে ফিরে এসে তিনি শাহজাদপুর উপজেলা সদরে মণিরামপুরে পিতার ক্রয়কৃত বাড়িতে সর্বসাধারনের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত হন। আমৃত্যু পর্যন্ত তিনি এই অত্যন্ত সাধারণ একটি টিনের বাড়ীতে একভাবে নামমাত্র ফি গ্রহন করে চিকিৎসার মাধ্যমে হৎদরিদ্রদের চিকিৎসায় নিরত থাকেন। সর্বসাধারণের কাছে তিনি ‘বুলবুল ডাক্তার’ নামেই পরিচিত ছিলেন। চিকিৎসা ক্ষেত্রে তাঁর যে অসাধারণ সাফল্য এবং সুনাম-সুখ্যাতি ছিল তাতে তিনি রীতিমত অর্থ-বিত্তের মালিক হতে পারতেন। কিন্তু চিকিৎসাকে তিনি মানুষের সেবা হিসাবে গ্রহন করেছিলেন, অর্থ উপার্জনের পন্থা হিসাবে নয়। তিনি খুব সহজ সরল জীবন যাপন করতেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৫২ সালে ক্ষতিগ্রস্থ অনেকেই এম.বি.বি.এস ডিগ্রি গ্রহন করেন। কিন্তু ডা. আজমল তাঁর চারপাশের মানুষ এবং রোগীদের ছেড়ে আর কখনোও ডিগ্রি লাভের পেছনে ছোটেন নি।
আজমল সব ধরনের বই এবং পত্রিকার নিষ্ঠাবান পাঠক ছিলেন। তিনি যা কিছু পড়তেন, তার মধ্যে নিমগ্ন হয়ে যেতেন। বাংলা, ইংরেজি, অংক, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সমকালীন বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল বিষ্ময়কর। জনাব আজমলের কাছে দেশ ও দেশের মানুষ ছিল নিজের চেয়ে বড়। তাইতো ছাত্র জীবন থেকে শুরু করে আমৃত্যু তিনি দেশের মানুষের অধিকার ও দাবী আদায়ে ছিলেন সোচ্চার। নিজের আরাম-আয়েশ ও স্বার্থ ত্যাগ করে সমাজের মানুষের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছেন।
এভাবেই একদিন ডা. আজমল জীবন সায়াহ্নে চলে আসেন। তাঁর জীবনের সমস্ত কাজ কর্মের সাথে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন তাঁর স্ত্রী খুরশিদা আজমল পুতুল। সেই স্ত্রীর মৃত্যুতে তিনি অনেকটা চুপচাপ হয়ে যান। ক্রমশ বেশ অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। শ্বাস কষ্টের সাথে অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেয়। ২০০২ সালে ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে একটানা ৫ দিন অচেতন থাকার পর ৩ অক্টোবর পরলোক গমন করেন। তাঁর মৃত্যুর পর শাহজাদপুরবাসীর দাবীর প্রেক্ষিতে হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহ.)’র মসজিদ ও মাজার সংলগ্ন দক্ষিণ পাশের কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।
ভাষা সৈনিক আলী আজমল ৪৮ ও ৫২ এর ভাষা আন্দোলনে অবদানে কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পেলেও তিনি পেয়েছেন শাহজাদপুর তথা সিরাজগঞ্জের মানুষের ভালোবাসা ও সন্মাননা। আমাদের সিরাজগঞ্জ পেজের পক্ষ থেকে তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং তাকে গভীরভাবে স্বরণ করছি।

